পৃষ্ঠাসমূহ

Saturday, October 22, 2016

জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীঃ সাফল্য ব্যর্থতার খতিয়ান

বিশ্বের সর্ববৃহৎ আন্তর্জাতিক সংঘটন জাতিসংঘ । বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার ব্রত নিয়ে ১৯৪৫ সালের ২৪শে অক্টোবর জাতিসংঘের যাত্রা শুরু হয় । প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লীগ অব নেশন্স বা জাতিপুঞ্জ নামের একটি আন্তর্জাতিক সংঘটন প্রতিষ্ঠা হলেও তা আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়। শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ । পরপর দুটো বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা থেকে জন্ম নেয়া এ সংঘটন আজ বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি এবং মানবাধিকার বিষয়ে পরস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষে কাজ করে যাচ্ছে । দীর্ঘ ৭০ বছরের এ পথ পরিক্রমায় তার ঝুলিতে রয়েছে উল্লেখযোগ্য সাফল্য, রয়েছে ব্যর্থতা ।






জাতিসংঘের সাফল্যঃ
বিশ্বশান্তি ও মানবাধিকার রক্ষাঃ জাতিসংঘ সনদের প্রস্তাবনা এবং ১নং অনুচ্ছেদে সংস্থাটির উদ্দেশ্যসমূহ বর্ণিত হয়েছে এভাবে- ১. বিশ্বব্যাপী শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা, ২. পৃথিবীর স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন, ৩. মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যাবলী নিরসনের দ্বারা সৃষ্ট বাধ্যবাধকতার প্রতি সুবিচার ও সম্মান প্রদর্শন করা । এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ বেশ কিছু সাফল্য অর্জন করেছে ।  ১৯৪৫ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত সংস্থাটি ১৭২টি (২০০৮ সাল পর্যন্ত) সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এতে অবসান হয়েছে অনেক আঞ্চলিক সংঘাতের। জাতিসংঘ তার নীরব কূটনীতির মাধ্যমে ৮০টিরও বেশি আসন্ন যুদ্ধ এড়াতে সক্ষম হয়েছে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটির মূল্যবোধ ও কার্যকর পদক্ষেপের কারণে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে বড় ধরনের কোনো সংঘাত হয়নি। সংস্থাটি ৫০টিরও বেশি দেশের স্বাধীনতা অর্জনে পালন করেছে সক্রিয় ভূমিকা। নব্বইয়ের দশকে নামিবিয়া, এলসালভেদর, মোজাম্বিক ও কম্বোডিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অবদান উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের উদ্যোগে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। দু বার বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলনের মধ্য দিয়ে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে জাতিসংঘ।
 ১৯৫০ সালে সৃষ্ট কোরিয়া সংকট, ১৯৫৬ সালে সৃষ্ট সুয়েজ সংকট, এবং কঙ্গো ও সাইপ্রাস সংকট নিরসনে জাতিসংঘ কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ইরান-ইরাক যুদ্ধ অবসানে জাতিসংঘ ১৯৮৭ সালের ২৫ জুন ৫৯৮নং প্রস্তাব গ্রহণ করে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরে দু দেশকে সহযোগিতা করে। নামিবিয়া ও পূর্ব তিমুরের স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৩ সালের মধ্যপ্রাচ্য সংকট, ১৯৯১ সালে ইরাক-কুয়েত সংকট, ১৯৯২ সালে বসনিয়া হার্জেগোভিনায় এবং সোমালিয়ায় শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করায় জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় ১৯৮৮ সালে এ বাহিনীকে দেয়া হয় নোবেল পুরস্কার। 

পরিবেশ রক্ষাঃ জাতিসংঘের কার্যক্রমের অন্যতম আরেকটি সাফল্য হল পরিবেশ রক্ষা ও এ বিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টি । প্রশান্ত মহাসাগরের গালাপাগোস দ্বীপমালাসহ অন্তত এক হাজার বিশ্বঐতিহ্য সংরক্ষণে জাতিসঙ্ঘের জোরালো ভূমিকা ছিল বিগত দিনে। ১৯৭৮ সালে গালাপাগোস দ্বীপমালাকে জাতিসঙ্ঘের সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১২ প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক স্থানের তালিকায় স্থান দেয়, যা জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এই দ্বীপমালাকে পর্যটন ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখে। এছাড়া জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা (UNEP) এর মাধ্যমে বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে থাকে 

নারী ক্ষমতায়নঃ জাতিসংঘের সাফল্যের আরেকটি অংশ হল জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণ কার্যক্রম । নারীর প্রতি সব প্রকার বৈষম্য দূরীকরণে ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘে সিডও সনদ অনুমোদিত হয়। ১৯৮১ সাল থেকে তা কার্যকর হয়। এ পর্যন্ত বাংলাদেশসহ ১৮০ টিরও বেশি দেশ এতে স্বাক্ষর করেছে।
এছাড়া সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ইত্যাদিতে জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে । 

দারিদ্র বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিঃ দারিদ্র বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও জাতিসংঘের কার্যক্রম প্রশংসনীয় । কারিগরি প্রশিক্ষন, কৃষি প্রশিক্ষন ইত্যাদি কার্যক্রমের মাধ্যমে জাতিসংঘ কাজ করে যাচ্ছে । International Fund for Agricultural Development (IFAD) এর মাধ্যমে জাতিসংঘ  এ পর্যন্ত ১৫ বিলিয়ন ডলার বযেয় করেছে । প্রায় ৩৪০ মিলিয়ন মানুষকে খাদ্য উৎপাদনে প্রশিক্ষন দিয়েছে। 

এছাড়াও অস্ত্র হ্রাসকরণ, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে, আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়নে, জাতিগত দ্বন্দ্ব নিরসনে জাতিসংঘের কার্যক্রম প্রশংসার দাবিদার ।


জাতিসংঘের ব্যর্থতাঃ

মধ্যপ্রাচ্যে ব্যর্থতাঃ জাতিসংঘের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় ঝুলিটি হল মধ্যপ্রাচ্য। ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংকট, আফগানিস্তানে ইরাক সিরিয়ায় মার্কিন আগ্রাসনে জাতিসংঘ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। ফিলিস্তিন-ইসরাইল সমস্যার সমাধান করতে না পারাকে জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ সমস্যা সমাধানে শুধু প্রস্তাব গ্রহণ করেই জাতিসংঘ ক্ষান্ত থেকেছে। লেবানন সংকট নিরসনে শুধু শান্তিরক্ষী বাহিনী গঠন করেই জাতিসংঘ তার দায়িত্ব শেষ করেছে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

নিরাপত্তা পরিষদের কাথামোঃ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো জাতিসংঘের সাফল্যের বড় বাঁধা । নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহার, জাতিসংঘ সনদের তোয়াক্কা না করা এবং সাধারণ পরিষদকে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে এড়িয়ে চলার মানসিকতার কারণে জাতিসংঘ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত রয়েছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন একতরফা হামলায় জাতিসংঘ দর্শকের ভূমিকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি। বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থা ও ন্যাটোর মত সামরিক সংগঠন জাতিসংঘের ওপর বিভিন্নভাবে প্রভাব তৈরি করেছে, যা সংগঠনটির স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে।

বৃহৎ শক্তির পক্ষপাতিত্তঃ বৃহৎ শক্তির প্রতি জাতিসংঘের পক্ষপাতিত্বও জাতিসংঘের ব্যর্থতার অন্যতম দিক । ১৯৯৫ সালে সেব্রেনিসায় সার্বিয়ান সৈন্যদের হাতে আট হাজার বসনিয়ান মুসলিম নির্মম গণহত্যার শিকার হয়। এটি ছিল জাতিসঙ্ঘের রুয়ান্ডা ব্যর্থতার চেয়েও ভয়াবহ। ওই সময় জাতিসঙ্ঘ সেব্রেনিসা শহরকে ‘সেফ জোন’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং ডাচ সৈন্যদের হাতে এর নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়। কিন্তু ডাচ কমান্ডারের সাথে সার্বিয়ার সেনাকর্মকর্তা জেনারেল রাটকো ম্লাডিচের যোগসাজশে সার্ব সৈন্যরা বেছে বেছে শহরের নিরীহ মুসলমান পুরুষদের হত্যা করে।
১৯৪৮ সালে বার্লিন সমস্যা, ১৯৬২ সালে কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস নিরসনে জাতিসংঘ নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। কসোভো ও বসনিয়া হার্জেগোভিনার যুদ্ধ বন্ধের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
জাতিসংঘ যদিও অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের মাধ্যমে সামাজিক ও অথনৈতিক উন্নয়নে তৎপর, কিন্তু বৃহৎ শক্তিগুলোর চাপ ও প্রাধান্য বিস্তারের প্রচেষ্টা এক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘ অনেক সময়-ই বৃহৎ শক্তিগুলোর ক্রীড়ানকে পরিণত হয়েছে।

শেষ কথা, দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ব্যর্থতা থাকলেও জাতিসংঘের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায় নি । জাতিসংঘের ব্যর্থতার মূলে রয়েছে বৃহৎ শক্তিদের রাজনৈতিক স্বার্থ । এছাড়াও জাতিসংঘের নিজস্ব সামরিক বাহিনী নেই । অন্তত সামাজিক ক্ষেত্রে জাতিসংঘ সফল একথা বলা যায় । জাতিসংঘ বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে একত্রিত করে। শান্তি রক্ষায় এর অবদানে প্রশ্ন থাকেলও শান্তির বার্তা পৌঁছে দিতে এর কার্যক্রম ক্ষুদ্র নয় ।  আগামী দিনে আরো ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এই প্রত্যাশা থাকলো ।


                                      পড়ুন  আন্তর্জাতিক আইন ও এর উৎস
                                               
                                                বিশ্ব রাজনীতির চক্রে বিশ্ব নিরাপত্তা

                                                দক্ষিন এশিয়ার রাজনীতি, রাজনীতির দক্ষিন এশিয়া


                                              দেখুন আমার আন্তর্জাতিক ব্লগ


শরীফ মুস্তাজীব

শিক্ষার্থী , আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ


No comments:

Post a Comment