মানব মস্তিষ্কের ক্রমবিকাশের সাথে সাথে মানুষ প্রকৃতিকে ব্যবহার করতে শিখেছে । ক্রমশ শিখেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আত্মরক্ষা করতে । নিত্যনতুন আবিষ্কার মানুষকে দিয়েছে বিস্ময়কর এক গতিশীলতা । শিল্পবিপ্লবের প্রক্কালে মানবজাতি পদার্পণ করেছে যান্ত্রিকশিল্পের এক নতুন অধ্যায়ে । এরই ধারাবাহিকতায় আজকের একবিংশ শতাব্দীর চরম উৎকর্ষতা । জ্ঞানবিজ্ঞানের এই অভূতপূর্ব সাফল্যে মানবজাতির কাছে পৃথিবীর সকল উদ্ভিদরাজি ও প্রাণীকুল মাথা নত করেছে । প্রাচীনকালের সেই মানুষ আজ হিংস্র হায়েনার ভয়ে ভয়ার্ত নয় । কিন্তু প্রকৃতি ও পরিবেশের উপাদানের যথাযোগ্য ব্যাবহার (optimum level) অতিক্রম করে মানুষ আজ নিজেই নিজের জন্য হুমকি !
সাম্প্রতিককালের “উন্নয়ন” ধারণা এক্ষেত্রে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব রাখে । উন্নয়নের পুঁথিগত ধারণা কিংবা অর্থনীতির সাধারণ আলোচনায় পণ্য সংস্কৃতির প্রভাব দেখি যেখানে তামাকজাত বা এ জাতীয় উৎপাদনকেও আয় বলে গণ্য করা হয় । মূলত উন্নয়ন ও পরিবেশের মুখোমুখি অবস্থান এখানেই । উন্নয়নের বাণিজ্যিক প্রচারে যুদ্ধও নিশ্চয় লাভজনক ব্যবসা !
পরিবেশ সুরক্ষায় কেউ কথা বললেই পুঁজিপতি ও শিল্পমালিকশ্রেণী তাদের উন্নয়নবিরোধী অপবাদ দিয়ে থাকেন । আসলে তারা পরিবেশ ও উন্নয়নের প্রকৃত সম্পর্ক যে পরস্পর বিরোধী নয়; তা এড়িয়ে যান । উদাহরণস্বরূপ আমরা জাতীয় আয়ের ধারণার অসম্পূর্ণতা বিবেচনা করতে পারি । একটি দেশের মোট উদ্ভিদরাজি যে পরিমাণ অক্সিজেন উৎপাদন করে (যাকে ইংরেজিতে বলা হয় Less-tangible ) তা কি আর্থিক হিসেবে রাখা হয় ? অথচ গাছ কেটে যে কাঠ উৎপাদন করা হয় তার বাজারমূল্যকে আয় বলে বিবেচনা করা হয় !
পরিবেশ ও উন্নয়নের প্রকৃত সম্পর্ক নির্ণয়ে অন্যতম বড় সমস্যা পরিবেশের সার্বজনীনতা । পরিবেশের উৎপাদন রাষ্ট্রীয় সীমানা মেনে চলে না । ফলে, বরাবরই শিল্পোন্নত দেশগুলোর কর্মফল সমগ্র বিশ্বকে সমভাবে ভোগ করতে হচ্ছে । পরিবেশের প্রতি তাদের নির্বিচার কার্যাবলীর দায়ভার পড়ছে সবার উপর । বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণের শতকরা ২৫ ও ১৪ নিঃসরণ করে যথাক্রমে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র । যার অনিবার্য ফলাফল ফলাফল ভোগ করছে স্বল্পোন্নত দেশগুলো।
অপরদিকে আমরা যতই টেকসই উন্নয়নের কথা বলি না কেন, প্রকৃত উন্নয়নে আমাদের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতাই আসল । এক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দায়ভার এড়াতে পারে না, প্রয়োজন নিজেদের উন্নয়নে পরিবেশগত দিক সর্বোচ্চ লক্ষ্য রাখা । অবশ্যই উন্নয়নের বিশ্বজনীন ধারণাকে সামনে রাখা অপরিহার্য । উন্নয়নের এই পরিবেশগত ও বিশ্বজনীন দিক বিবেচনায় না রাখার ফলে বিশ্বব্যাপী এ উন্নয়ন অসম ও অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়ছে যা ক্রমশ বুমেরাং হয়ে ফিরে আসবে পুরো মানব সভ্যতার উপর ।
১৯৭২ সালের স্টকহোম সম্মেলনের পর নব্বই দশকের দিকে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের পরিবেশ ভাবনা বেশ আশাজাগানিয়া ছিল যা ক্রমশ হতাশাব্যঞ্জক হয়ে পড়ছে তাদের স্বার্থবাদী নীতির ফলে । কিয়েটো প্রোটকলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ স্থিমিত হয়ে পড়েছে শিল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থান্বেষী মনোভাবে । তবে প্রোটোকলের ১৮ তম অনুচ্ছেদের “কার্বন ট্রেডিং” একটি চমৎকার ধারণা যা উন্নয়ন ও পরিবেশের গঠনমূলক সম্পর্কের যুগপৎ ভিত্তি রচনা করে । কার্বন ট্রেডিং বলতে বলা হয়েছে কোন প্রতিষ্ঠানকর্তৃক নির্গত কার্বনের সমানুপাতে কার্বন শোষণ করার প্রাকৃতিক ব্যবস্থা । ধরা যাক কোন প্রতিষ্ঠান ১০০ টন কার্বন নির্গত করছে । অতএব এ প্রতিষ্ঠানকে ঐ ১০০ টন কার্বন শোষণ করে এমন পরিমাণ বৃক্ষ রোপণ করতে হবে । আমরা এ ধরনের উদ্ভাবনী পরিবেশগত উন্নয়নে ফলপ্রসূ হতে পারে ।
এবার বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন নিয়ে পরিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক যে বিতর্ক চলছে তার আলোকপাত করা যাক । সন্দেহ নেই, একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি সময়ের দাবী । অপরদিকে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনও বাংলাদেশের অস্তিত্বের অপরিহার্য উপাদান । সুন্দরবনকে বলা হয় বাংলাদেশের ফুসফুস । এখানেও ঠিক পরিবেশকে উন্নয়নের মুখোমুখি দাড় করানো হয়েছে । প্রকল্পের আনুষঙ্গে এটা সহজবোধ্য যে এই প্রকল্পে স্বচ্ছতার অভাব যথেষ্ট ।
বাংলাদেশের ইআইএ (Environmental Impact Assessment) প্রতিবেদন অনুসারেই প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকার ১০ কিমি ব্যাসার্ধের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রয়েছে ৭৫ শতাংশ কৃষি জমি, যেখানে বছরে ৬২ হাজার ৩৫৩ টন ধান এবং ১ লাখ ৪০ হাজার ৪৬১ টন অন্যান্য শস্য উৎপাদিত হয়। গরান (ম্যানগ্রোভ) বনের সঙ্গে এই এলাকার নদী ও খালের সংযোগ থাকায় এখানে বছরে ৫,২১৮ দশমিক ৬৬ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়ন করতে গেলে প্রকল্প এলাকার ফসল ও মৎস্য সম্পদ উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তথাপি প্রকল্পের জন্য ১৮৩৪ একর কৃষি, মৎস্য চাষ ও আবাসিক এলাকার জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যার ৯৫ শতাংশই তিনফসলি কৃষি জমি, যেখানে বছরে ১২৮৫ টন ধান ও ৫৬৯ দশমিক ৪১ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। এই ধান-মাছ উৎপাদন বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে এখন প্রায় ৮ হাজার পরিবার উচ্ছেদ হবে, যার মধ্যে উদ্বাস্তু এবং কর্মহীন হয়ে যাবে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ পরিবার। (১) অথচ Bangladesh Climate Change Strategy and Action Plan 2009 এ খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবেলার কথা বলা হয়েছে (পৃষ্ঠা ২৭) । এছাড়াও এই প্রকল্পে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম বাজার দামের চেয়ে বেশি হবে । এই বিদ্যুৎ আদৌ ঐ এলাকার জনগণের ক্রয়সীমার মধ্যে থাকবে কি না তা ও বিবেচ্য । ফলে এই বিদ্যুৎ প্রকল্প কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথাযথ কারণ রয়ে যায় ।
এমতাবস্থায় আমরা বিকল্প ব্যবস্থায় যেতে পারি । যেমন, জিও-থার্মাল, সৌরশক্তি, বায়ু, ইত্যাদিকে গ্রহণ করতে পারি । সর্বাধিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী চীনও এখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের বিকল্পের দিকে যাচ্ছে । এক্ষেত্রে সবচে পরিবেশবান্ধব হল জিও- থার্মাল প্রযুক্তি । এটি ভূগর্ভের তাপ কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রক্রিয়া । তবে জিও-থার্মাল প্রযুক্তি বেশ ব্যয়বহুল । ছোট পরিসরে হলেও এটি শুরু করা যেতে পারে । সৌরশক্তি বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক । বাংলাদেশের ৭০ ভাগ সূর্যরশ্নি ব্যবহারযোগ্য । বিকিরিত রশ্নির উৎপাদন ক্ষমতা প্রতি মিটারে ৪-৬.৫ মেগা ওয়াট(২) । এছাড়াও এ অঞ্চলে বায়ু প্রবাহিত হয় গড়ে ৩ মিটার/ সেকেন্ড বেগে । এটাকে কাজে লাগানো যেতে পারে বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে । এছাড়াও সমুদ্রস্রোত কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে ।
বাংগ্লাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০০০০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে । যেখানে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র ১৩২০ মেগা ওয়াট । এই স্বল্প পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে সুন্দরবনের মত একটা অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়াটা অত্যন্ত আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত ।
বাংলাদেশের ইআইএ (Environmental Impact Assessment) প্রতিবেদন অনুসারেই প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকার ১০ কিমি ব্যাসার্ধের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রয়েছে ৭৫ শতাংশ কৃষি জমি, যেখানে বছরে ৬২ হাজার ৩৫৩ টন ধান এবং ১ লাখ ৪০ হাজার ৪৬১ টন অন্যান্য শস্য উৎপাদিত হয়। গরান (ম্যানগ্রোভ) বনের সঙ্গে এই এলাকার নদী ও খালের সংযোগ থাকায় এখানে বছরে ৫,২১৮ দশমিক ৬৬ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়ন করতে গেলে প্রকল্প এলাকার ফসল ও মৎস্য সম্পদ উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তথাপি প্রকল্পের জন্য ১৮৩৪ একর কৃষি, মৎস্য চাষ ও আবাসিক এলাকার জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যার ৯৫ শতাংশই তিনফসলি কৃষি জমি, যেখানে বছরে ১২৮৫ টন ধান ও ৫৬৯ দশমিক ৪১ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। এই ধান-মাছ উৎপাদন বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে এখন প্রায় ৮ হাজার পরিবার উচ্ছেদ হবে, যার মধ্যে উদ্বাস্তু এবং কর্মহীন হয়ে যাবে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ পরিবার। (১) অথচ Bangladesh Climate Change Strategy and Action Plan 2009 এ খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবেলার কথা বলা হয়েছে (পৃষ্ঠা ২৭) । এছাড়াও এই প্রকল্পে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম বাজার দামের চেয়ে বেশি হবে । এই বিদ্যুৎ আদৌ ঐ এলাকার জনগণের ক্রয়সীমার মধ্যে থাকবে কি না তা ও বিবেচ্য । ফলে এই বিদ্যুৎ প্রকল্প কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথাযথ কারণ রয়ে যায় ।
এমতাবস্থায় আমরা বিকল্প ব্যবস্থায় যেতে পারি । যেমন, জিও-থার্মাল, সৌরশক্তি, বায়ু, ইত্যাদিকে গ্রহণ করতে পারি । সর্বাধিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী চীনও এখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের বিকল্পের দিকে যাচ্ছে । এক্ষেত্রে সবচে পরিবেশবান্ধব হল জিও- থার্মাল প্রযুক্তি । এটি ভূগর্ভের তাপ কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রক্রিয়া । তবে জিও-থার্মাল প্রযুক্তি বেশ ব্যয়বহুল । ছোট পরিসরে হলেও এটি শুরু করা যেতে পারে । সৌরশক্তি বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক । বাংলাদেশের ৭০ ভাগ সূর্যরশ্নি ব্যবহারযোগ্য । বিকিরিত রশ্নির উৎপাদন ক্ষমতা প্রতি মিটারে ৪-৬.৫ মেগা ওয়াট(২) । এছাড়াও এ অঞ্চলে বায়ু প্রবাহিত হয় গড়ে ৩ মিটার/ সেকেন্ড বেগে । এটাকে কাজে লাগানো যেতে পারে বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে । এছাড়াও সমুদ্রস্রোত কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে ।
বাংগ্লাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০০০০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে । যেখানে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র ১৩২০ মেগা ওয়াট । এই স্বল্প পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে সুন্দরবনের মত একটা অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়াটা অত্যন্ত আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত ।
লেখক
শরীফ মুস্তাজীব
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
পড়ুন ইংরেজি ভার্সন
(১) Environmental Impact of Coal based Power Plant of Rampal on the Sundarbans and Surrounding areas, Dr. Abdullah Harun Chowdhury, KU
(২) Present Situation of Renewable Energy of Bangladesh: Renewable Energy Existing in Bangladesh by Md Saydur Rahman, Sohag Kumar Saha, Md Rakib Hasan Khan, Ummay Habiba, Sheikh Mubinul Hasan Choudhury, PUST

No comments:
Post a Comment