পৃষ্ঠাসমূহ

Monday, March 30, 2020

জীবাণু অস্ত্র কী এবং কিভাবে প্রয়োগ করা হয়?

প্রাচীনকাল থেকেই মানব সমাজে অস্ত্রের ব্যবহার হয়ে আসছে। অস্ত্রের ব্যবহার কখনো বা শিকার এর কাজে, কখনো বা আত্মরক্ষায় আবার কখনো বা শত্রুকে ঘায়েল করতে ব্যবহৃত হতো। জ্ঞান-বিজ্ঞান এর প্রসারের সাথে পাল্লা দিয়ে অস্ত্রের কৌশলও আধুনিক হতে থাকে। আবার কেউ কেউ নিছক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করতে গিয়ে আবিষ্কার করে ফেলেন, যেমনটি দেখি আলফ্রেড নোবেল এর ক্ষেত্রে। তার আবিষ্কৃত ডিনামাইট অস্ত্রের উপাদানকে আরো ভয়াবহ করে তোলে। পরবর্তীতে এই ঘটনা তাকে খুবই অনুতপ্ত করে তোলে, তিনি তার অর্জিত সব অর্থ মানব কল্যানে নিয়োজিত করার সংকল্প গ্রহন করেন। তার নামেই চালু হয় নোবেল প্রাইজ। কিন্তু তার এই উদ্যোগ অস্ত্রের ব্যবহার রোধ করতে পারেনি।

বিশ্বব্যাপী অস্ত্রের উৎপাদন যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি আজকের দিনে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও রাশিয়ার মতো দেশের জন্য অস্ত্র একটি বড় বাণিজ্য। এই কাতারে যোগ দিয়েছে চীন। বিশ্বরাজনীতির গতিপ্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে অন্যতম একটি ভূমিকা রাখে অস্ত্র বাজার। দেশে দেশে সংঘাত- সংঘর্ষ বৃদ্ধির নেপথ্যে আছে অস্ত্র ব্যাবসায়ীদের কূটচাল। অশান্ত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এই অস্ত্রের খেলা আমরা দেখি বরাবরই।

কিন্তু অস্ত্রের আবিষ্কারক ও ব্যবহারকারী মানব জাতির অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলেছে এই অস্ত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমানবিক অস্ত্রের প্রয়োগ মানব জাতির ইতিহাসে একটা ভয়ংকর ঘটনা। হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহর মুহুর্তেই ধূলোয় ধুসর হয়ে গিয়েছিল "লিটল বয়" ও "ফ্যাটম্যান" নামক দুটো পারমানবিক বোমার আঘাতে।এরপরও থেমে থাকেনি অস্ত্রের ব্যবহার। একে একে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, ভারত, পাকিস্তান, ইসরাইল ও উত্তর কোরিয়া পারমানবিক বোমার তৈরি করে। ইরানও পারমানবিক বোমার অধিকারী বলে ধারনা করা হয়।

এখানেই শেষ নয়; উৎপাদিত হয়েছে রাসায়নিক বোমা ও জীবাণু বোমা। রাসায়নিক গ্যাস আকারে ব্যবহার করা রাসায়নিক বোমা সিরিয়ার লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে। আর এর সর্বশেষ সংযোজন হলো জীবাণু অস্ত্র (biological weapons)। কিন্তু কী এই জীবাণু অস্ত্র? করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ এর ভয়াবহ ব্যপকতার পর প্রশ্নটি বারবার আলোচিত হচ্ছে যে করোনা একটি জীবাণু অস্ত্র কি না। তার আগে জেনে নেই জীবাণু অস্ত্র কীঃ




জীবাণু অস্ত্রের ব্যবহার মানব জাতির অস্তিত্বকে হুমকীতে ফেলবে 

জীবাণু অস্ত্র হলো এমন একটি মাধ্যম যেমনঃঃ ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক, ফাংগাস, পতঙ্গ ইত্যাদি যাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয় সাধারণ ( civilian) মানুষজনের ক্ষতিসাধন করার জন্য। যেমন ঃঃ এনথ্রাক্স, যেটি পশুর মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো। সালমোনোলা ব্যাকটেরিয়া, যেটি যুক্তরাষ্ট্রের একটা শহরে রেস্তোরার সালাদে প্রয়োগ করা হয়েছিল। ফলে ব্যাপর মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। তবে চিকিৎসাক্ষেত্রে গবেষণা ও ঔষধ তৈরিতে এর ব্যবহার অনুমোদিত। এই জীবাণু অস্ত্রের ব্যবহার রোধে প্রচেষ্টাও কম হয়নি। ১৯২৫ সালের জেনেভা কনভেনশনে প্রথম এই বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। এরপর ১৯৭২ করা হয় "আন্তর্জাতিক জীবাণুঅস্ত্র রোধ বিষয়ক কনভেনশন"। বিশ্বের প্রায় ১৮৩ টি দেশ এতে অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু বাস্তবিকক্ষেত্রে বা বাস্তবাদের রাজনীতিতে অন্যান্য চুক্তির মতো এটিও একটি কাগুজে উপাদানে পরিণত।


 জীবাণু অস্ত্রের অধুনিক ইতিহাস এর শুরু সতেরোশ শতকে। ১৭৬৩-৬৪ সালে ব্রিটিশ নেভী কর্তৃক প্রয়োগকৃত প্লেগ ভাইরাসে যুক্তরাষ্ট্রের অহিও অঞ্চলের সহস্রাধিক মানুষ এর মৃত্যু ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়। এরপর ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু, ২০০২ সালের সার্স, ২০০৯ সালের এনথ্রাক্স ইত্যাদির প্রাদুর্ভাবকে জীবাণু অস্ত্রের ব্যবহার বলে দাবী করা হয়। গবেষণায় দেখা গেসে জীবাণু অস্ত্রে প্রথাগত অস্ত্রের চেয়ে অনেক কম খরচে ব্যাপক ক্ষতি করা যায়। ২০১৭ সালে প্রকাশিত SIU School of Medicine এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে জীবানু অস্ত্র প্রথাগত সামরিক অস্ত্রের মাত্র ০.৫ শতাংশ খরচে সমান ক্ষতিসাধন করতে সক্ষম। এছাড়াও এটি শত্রুপক্ষের অজান্তেই আঘাত করে।


এবার দেখা যাক করোনা ভাইরাস একটি জীবাণু অস্ত্র কি না। করোনা ভাইরাস এর প্রাদুর্ভাব হওয়ার পর ওয়াশিংটন টাইমস এ দাবী করা হয় যে করোনা চীন কর্তৃক আবিষ্কৃত একটি জীবাণু অস্ত্র। আবার পাল্টা দাবী করা হয় চীনের পক্ষ থেকে যে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি অস্ত্র যা সাম্প্রতিক সময়ে তাদের একটি সামরিক দল চীন ভ্রমণের সময় নিয়ে আসে। এই বিতর্কে জ্বালানী যুগিয়েছে ১৯৮১ সালে আমেরিকা থেকে প্রকাশিত একটি বই End of the Day। এখানে লেখিকা দাবী করেন যে ২০২০ সালে চীনের উহানে এমন একটি ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটবে যা মানব জাতিকে নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম। তবে এটি কোন বৈজ্ঞানিক গবেষণা এর তথ্য নয়। তবুও এই সন্দেহ দানা বাঁধে যে চীন কেন প্রাথমিকভাবে করোনার তথ্য গোপন করে চেয়েছিল!

শরীফ মুস্তাজীব
Editor, International Affairs                            

No comments:

Post a Comment