"বিশ্বায়ন" শব্দটির সাথে আমরা অনেকেই পরিচিত। বর্তমান বিশ্বের প্রায় প্রতিটি মানুষ-ই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিশ্বায়নে সংযুক্ত। পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে মানুষে মানুষে সংযুক্তি, তড়িৎ যোগাযোগ ব্যবস্থা, মুক্তবাজার ব্যবস্থা, তথ্যপ্রবাহ - সবকিছু মিলিয়ে আমরা আজ বিশ্বগ্রাম (global village) এর বাসিন্দা।
বিশ্বায়নের শুরু সেই অনাদিকাল থেকে। সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই মানুষ পরিভ্রমণ করেছে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে; কখনো অজানাকে জানার আগ্রহে আবার কখনো বা আত্মরক্ষার্থে। একটা সময় মানুষ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো গোলকজুড়ে। দেশ থেকে মহাদেশে বাণিজ্য করতে শুরূ করলো। ধর্ম প্রচারে ভ্রমণ করলো দেশ দেশান্তর। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতা এই পথ-পরিক্রমাকে ত্বরান্বিত করলো গত শতকে। আজকের শতকে আমরা বিশ্বায়নের শিখরে দাড়িয়ে। প্রশ্ন জাগে- এই বিশ্বায়ন কি শুধুই জ্ঞান-বিজ্ঞান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ সংযুক্তি নাকি মুদ্রার অপর পিঠে আরো কিছু ঘটে চলেছে। অর্থনীতির বিশ্বায়নে কি সকলে সমান সুফল লাভে করছে, নাকি পুঁজিবাদের শিকড় বিস্তৃত হচ্ছে। সংষ্কৃতির বিনিময় বেড়েছে, নাকি পপুলার কালচারে হারিয়ে যাচ্ছে দেশজ ও স্থানীক কৃষ্টি। এই বিশ্বায়ন কি পৃথিবীকে নিরাপদ, নাকি আরো বেশি অনিরাপদ করেছে- বেড়েছে অপরাধীদের যোগাযোগ।
সর্বশেষ যে প্রশ্নটি আমাদের আসামীর কাঠগড়ায় দাড় করিয়েছে তা হলো, এই বিশ্বায়ন কি রোগ-ব্যাধি-সংক্রমণের বিশ্বায়ন নয়? করোনা বা কোভিড-১৯ নামক এক প্রাণঘাতী ভাইরাস এর বিশ্বভ্রমণ বিশ্বায়নের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শুধু তাই নয়, প্রশ্নটা জোরালো হয়েছে যে, অনিরাপত্তার বিশ্বায়নের (globalization of insecurity) জন্য কি আমরা প্রস্তুত?
সংক্রমক রোগ, মহামারি বিশ্ব ইতিহাসে নতুন নয়। প্লেগ, কলেরায় মড়ক লেগেছিলো আগেও। কিন্তু, আজকের করোনা ও তখনকার মহামারির মৌলিক তফাৎ আছে। আজকের করোনা যতোটা না স্বাস্থ্য সম্পর্কিত, তারও বেশি অর্থনীতি- রাজনীতি সম্পর্কিত। গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতে বিশাল ব্যবধান গড়ে দিয়েছে এই ভাইরাস।আমদানি-রফতানি, যোগাযোগ খাত, তৈরি পোষাক খাত, টুরিজম সহ প্রায় প্রতিটি খাতে ব্যাপক ক্ষতিসাধন ঘটেছে। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি এর সাথে বিশ্বায়নের নেতিবাচক দিকটির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা? তাহলে কি প্রশ্ন জাগে না, বিশ্বায়নের এই দিকগুলো নিয়ে আমাদের আরো সতর্কতা অবলম্বন জরুরি?
পড়ুনঃ করোনা বিশ্বব্যবস্থায় কী কী পরিবর্তন আনবে?
বিশ্বায়নের এই অধ্যায়ে রাষ্ট্র এর যে সংকটটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয় তা হলো নিরাপত্তা'র সংকট (security paradox)। রাষ্ট্র কি রক্ষনশীল নীতি (conservative policy) গ্রহন করবে, নাকি আন্তর্জাতিক সম্পর্কে আরো বেশি উদারনীতি গ্রহন করবে। যদি রক্ষনশীল নীতি গ্রহন করে তাহলে তার বৈদেশিক নির্ভরশীলতাকে কিভাবে মোকাবেলা গ্রহন করবে। ঠিক তেমনিভাবে উদারনীতি গ্রহন করে এই ধরণের সংক্রামক ঝুঁকি কিভাবে সামাল দেবে। আমরা যদি উত্তর কোরিয়ার নীতি পর্যালোচনা করি তাহলে দেখি, দেশটি বরাবরই বিচ্ছিন্ন নীতি গ্রহন করে। করোনা অবস্থায় তাদের দাবী তারা করোনা আক্রান্ত নয়। কিন্তু এই দাবীর সত্যাসত্য বিচারের সুযোগই প্রায় শূন্য কেননা দেশটি বৈদেশিক কোন তথ্য সংগ্রহকারীদের তাদের দেশে অনুমোদন দেয় না। আবার চমৎকার উদাহরণ দেখি পার্শ্ববর্তী দেশ দক্ষিন কোরিয়া ও সিংগাপুর এর ক্ষেত্রে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় তারা বেশ ভালো উদাহরণ গড়েছে। তবুও এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় সার্বিক নীতি কী হতে পারে তা আলোচনার দাবী রাখে। যেমন সিংগাপুর ও দক্ষিন কোরিয়া নিজেরা ভাইরাস প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো যতক্ষন না এই অবস্থা থেকে উত্তোরণ না হচ্ছে ততক্ষণ তারাও নিরাপদ নয়, অন্তত তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি স্বাভাবিক হতে পারবে না। এখানেই বিশ্বায়নের ধাঁধা!
শরীফ মুস্তাজীব
Editor,
International Affairs
বিশ্বায়নের শুরু সেই অনাদিকাল থেকে। সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই মানুষ পরিভ্রমণ করেছে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে; কখনো অজানাকে জানার আগ্রহে আবার কখনো বা আত্মরক্ষার্থে। একটা সময় মানুষ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো গোলকজুড়ে। দেশ থেকে মহাদেশে বাণিজ্য করতে শুরূ করলো। ধর্ম প্রচারে ভ্রমণ করলো দেশ দেশান্তর। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতা এই পথ-পরিক্রমাকে ত্বরান্বিত করলো গত শতকে। আজকের শতকে আমরা বিশ্বায়নের শিখরে দাড়িয়ে। প্রশ্ন জাগে- এই বিশ্বায়ন কি শুধুই জ্ঞান-বিজ্ঞান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ সংযুক্তি নাকি মুদ্রার অপর পিঠে আরো কিছু ঘটে চলেছে। অর্থনীতির বিশ্বায়নে কি সকলে সমান সুফল লাভে করছে, নাকি পুঁজিবাদের শিকড় বিস্তৃত হচ্ছে। সংষ্কৃতির বিনিময় বেড়েছে, নাকি পপুলার কালচারে হারিয়ে যাচ্ছে দেশজ ও স্থানীক কৃষ্টি। এই বিশ্বায়ন কি পৃথিবীকে নিরাপদ, নাকি আরো বেশি অনিরাপদ করেছে- বেড়েছে অপরাধীদের যোগাযোগ।
সর্বশেষ যে প্রশ্নটি আমাদের আসামীর কাঠগড়ায় দাড় করিয়েছে তা হলো, এই বিশ্বায়ন কি রোগ-ব্যাধি-সংক্রমণের বিশ্বায়ন নয়? করোনা বা কোভিড-১৯ নামক এক প্রাণঘাতী ভাইরাস এর বিশ্বভ্রমণ বিশ্বায়নের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শুধু তাই নয়, প্রশ্নটা জোরালো হয়েছে যে, অনিরাপত্তার বিশ্বায়নের (globalization of insecurity) জন্য কি আমরা প্রস্তুত?
সংক্রমক রোগ, মহামারি বিশ্ব ইতিহাসে নতুন নয়। প্লেগ, কলেরায় মড়ক লেগেছিলো আগেও। কিন্তু, আজকের করোনা ও তখনকার মহামারির মৌলিক তফাৎ আছে। আজকের করোনা যতোটা না স্বাস্থ্য সম্পর্কিত, তারও বেশি অর্থনীতি- রাজনীতি সম্পর্কিত। গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতে বিশাল ব্যবধান গড়ে দিয়েছে এই ভাইরাস।আমদানি-রফতানি, যোগাযোগ খাত, তৈরি পোষাক খাত, টুরিজম সহ প্রায় প্রতিটি খাতে ব্যাপক ক্ষতিসাধন ঘটেছে। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি এর সাথে বিশ্বায়নের নেতিবাচক দিকটির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা? তাহলে কি প্রশ্ন জাগে না, বিশ্বায়নের এই দিকগুলো নিয়ে আমাদের আরো সতর্কতা অবলম্বন জরুরি?
পড়ুনঃ করোনা বিশ্বব্যবস্থায় কী কী পরিবর্তন আনবে?
বিশ্বায়নের এই অধ্যায়ে রাষ্ট্র এর যে সংকটটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয় তা হলো নিরাপত্তা'র সংকট (security paradox)। রাষ্ট্র কি রক্ষনশীল নীতি (conservative policy) গ্রহন করবে, নাকি আন্তর্জাতিক সম্পর্কে আরো বেশি উদারনীতি গ্রহন করবে। যদি রক্ষনশীল নীতি গ্রহন করে তাহলে তার বৈদেশিক নির্ভরশীলতাকে কিভাবে মোকাবেলা গ্রহন করবে। ঠিক তেমনিভাবে উদারনীতি গ্রহন করে এই ধরণের সংক্রামক ঝুঁকি কিভাবে সামাল দেবে। আমরা যদি উত্তর কোরিয়ার নীতি পর্যালোচনা করি তাহলে দেখি, দেশটি বরাবরই বিচ্ছিন্ন নীতি গ্রহন করে। করোনা অবস্থায় তাদের দাবী তারা করোনা আক্রান্ত নয়। কিন্তু এই দাবীর সত্যাসত্য বিচারের সুযোগই প্রায় শূন্য কেননা দেশটি বৈদেশিক কোন তথ্য সংগ্রহকারীদের তাদের দেশে অনুমোদন দেয় না। আবার চমৎকার উদাহরণ দেখি পার্শ্ববর্তী দেশ দক্ষিন কোরিয়া ও সিংগাপুর এর ক্ষেত্রে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় তারা বেশ ভালো উদাহরণ গড়েছে। তবুও এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় সার্বিক নীতি কী হতে পারে তা আলোচনার দাবী রাখে। যেমন সিংগাপুর ও দক্ষিন কোরিয়া নিজেরা ভাইরাস প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো যতক্ষন না এই অবস্থা থেকে উত্তোরণ না হচ্ছে ততক্ষণ তারাও নিরাপদ নয়, অন্তত তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি স্বাভাবিক হতে পারবে না। এখানেই বিশ্বায়নের ধাঁধা!
শরীফ মুস্তাজীব
Editor,
International Affairs


No comments:
Post a Comment