পৃষ্ঠাসমূহ

Monday, June 15, 2020

চীনের উত্থান রোধে ভারত কি আমেরিকার স্যাটেলাইটে পরিণত হচ্ছে?

স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে আমেরিকা বিশ্ব-ব্যবস্থায় একাধিপত্য করে যাচ্ছে। বিশ্ব-ব্যবস্থার নেতৃত্ব (hegemony) সুদৃঢ় রাখতে আমেরিকা বরাবরই বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছে। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য ছিল অপর কোন রাষ্ট্রকে তার সমকক্ষ হতে না দেওয়া। যার ফলে আমেরিকা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কৌশলে দেশগুলোকে অনবদমিত করেছে; এই দলে যেমন রয়েছে তার নিকট প্রতিবেশী, তেমনি রয়েছে দূরবর্তী কোন রাষ্ট্র। রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, জাপান, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশকে অবলম্বন করে বরাবরই আমেরিকা নিজের লক্ষ্য স্থির রেখেছে। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের উত্থান আমেরিকার জন্য মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। তাই বিভিন্ন কৌশলে চীনকে নিয়ন্ত্রণ করতে আমেরিকা বদ্ধপরিকর। আর এক্ষেত্রে ভারত কিভাবে আমেরিকার কৌশলগত বন্ধুর আবেশে চীন রোধে আমেরিকার হাতিয়ার হয়ে পড়েছে তা আলোচনার বিষয়।



বিশ্ব-ব্যবস্থায় একাধিপত্যের কৌশলঃ

বিশ্ব-রাজনীতিতে একটি রাষ্ট্র যখন একাধিপত্যে থাকে সে ব্যবস্থাকে বলা হয় এককেন্দ্রিক ব্যবস্থা (unipolar)। সোভিয়েত ইউনিয়ন এর পতনের পর থেকে বিশ্ব-ব্যবস্থা আমেরিকার একাধিপত্যেই চলছিল। এই সময়কালে আমেরিকা নিজ সুবিধার্থে উদারনৈতিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করে। বিভিন্ন ছদ্মবেশে নিজেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পরাক্রমশালী করে নিতে থাকে। এই সময়কালে যখনই কোন রাষ্ট্র আমেরিকার একাধিপত্য চ্যালেঞ্জ করার মতো কার্যক্রম করতে শুরু করেছে, আমেরিকার তাকে নিবৃত্ত করতে (strategic containment) যেকোন ধরনের পদক্ষেপ নিতে পিছপা হয়নি।

         বিশ্বব্যবস্থায় আমেরিকা ও অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহ                   (image source: World Affairs)

 উদাহরণস্বরূপ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে আলোচনায় রাখা যায়। আমেরিকার গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী বলে নিজেকে পরিচয় দিলেও আদতে মধ্যপ্রাচ্যে তার দোসরগুলো একনায়ক। অন্যদিকে যখনই কোন রাষ্ট্র তার জাতীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর বলে প্রতীয়মান হয়েছে তখনই আমেরিকা তাকে অনবদমিত করেছে; যদিও ঐ রাষ্ট্র তার দীর্ঘসময়ের দোসর বলে পরিচিত। এ প্রসঙ্গে জাপানের উদাহরণ দেওয়া যায়। ১৯৮০ সালের দিকে জাপান যখন মটরগাড়ি ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে এগিয়ে যেতে থাকে তখনই আমেরিকার জাপানকে কৌশলগত ফাঁদে ফেলে "প্লাজা একর্ড" এর মাধ্যমে। অন্যদিকে উদীয়মান রাষ্ট্রগুলোকে আয়ত্তে আনতে "প্রক্সি ওয়ার" আমেরিকার পুরোনো কৌশলগুলোর একটি। ২০১২ সালে রাশিয়াকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ক্রিমিয়া কৌশল তার উদাহরণ। এখন প্রশ্ন হলো ভারত কিভাবে চীন মোকাবেলায় আমেরিকার স্যাটেলাইটে পরিণত হচ্ছে। তা বোঝার জন্য এই প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে আনুষঙ্গিক বিষয়াবলী তুলে ধরা হল।

আমেরিকার ভারত কৌশলঃ
স্নায়ু যুদ্ধের (cold war) অবসানের পর চীনের অর্থনীতির পালে হাওয়া লাগতে শুরু করে। ভারী ও মাঝারি শিল্পে চীন এগিয়ে যেতে থাকে। এদিকে রাশিয়াকে নিবৃত্ত রাখতে আমেরিকা চীনকে বেছে নেয়। চীনের সাথে বাণিজ্য বাড়তে থাকে আমেরিকার। এরই মধ্যে চীনের উৎপাদন ব্যবস্থা প্রভূত উন্নতি লাভ করে। এসময়ে চীনের নীতি ছিল "নীরবে শক্তি সঞ্চার ও সক্ষমতা অর্জন"। কিন্তু একবিংশ শতকের শুরতে, বিশেষতঃ ২০০৯ সালের দিকে চীনের জিডিপি'র আকাশচুম্বী অবস্থানে আমেরিকার টনক নড়ে।
স্বাভাবিকভাবেই চীনকে রুখতে হলে বিভিন্ন আঙ্গিকে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ভারতকেই বেছে নেয় আমেরিকা। আঞ্চলিক রাজনীতির হিসাব-নিকাশেও ভারত আমেরিকার শিকারে পরিণত হয়।
দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকার পূর্বেকার মিত্র পাকিস্তান বরারবই আমেরিকার চালে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। অস্ত্রব্যবসা ও কাশ্মীর সংকট ব্যতীত আর কোন সহযোগিতা পায়নি পাকিস্থান। ২০১০ সালের আমেরিকার Pivot to Asia নীতিতে আমেরিকার ভারতমুখীতার অন্যতম কারন হলো ২০০ বিলিয়ন জনসংখ্যার বাজার, অস্ত্রব্যবসা এবং ভারত মহাসাগরে নিজের অবস্থান পোক্ত করা। ইতোমধ্যেই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত পরিবর্তন ও চীনের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এর প্রভাবে অনেক রাষ্ট্রই আমেরিকার প্রতি তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার পলিসি বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে, উত্তর কোরিয়ার সাথেও ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতৃত্বাধীন আমেরিকার নমনীয়তা অবিদিত নয়। এমতাবস্থায় ভারত আমেরিকার সাথে বাণিজ্য, কূটনীতি, সামরিক খাতে যে মিত্রতা স্থাপন করেছে তাতে ভারত দীর্ঘমেয়াদে আমেরিকার প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে চীনের সাথে ভারসাম্য রক্ষায় নিজস্ব কৌশলের অভাবে ভারত বরাবরই চীনের রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে। এছাড়াও বিজেপি সরকার ট্রাম্প এর অনুকরণে জনতুষ্টি ও বিভেদের যে রাজনীতি করছে তা দীর্ঘমেয়াদে ভারতকে ক্ষতিগ্রস্ত-ই করবে।

আরও পড়ুনঃ করোনা ভাইরাস এর জন্য কি চীন দায়ী?

Sharif Mustajib
Editor,
Voice of International Affairs        

No comments:

Post a Comment