Tuesday, October 11, 2016

নোবেল শান্তি পুরস্কারের রাজনৈতিক বিবর্তন

নাঈম হোসেন



নোবেল শান্তি পুরস্কার যেভাবে বিবর্তিত হচ্ছে তাতে এ পুরস্কার সম্পর্কে কিছু কথা না বললেই নয়। এটা সত্য যে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত থাকাটা কঠিন, আর যখন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের কাজের মূল্যায়নের প্রশ্ন আসে তখন তা প্রায় অসম্ভবের পর্যায়ে পড়ে। তো বলছিলাম যে, নোবেল শান্তি পুরস্কারটির রাজনীতিকরন হয়েছে আসলে অনেক আগেই, এখন যা হচ্ছে তাহলো 'রাজনৈতিক বিবর্তন'। যদিও অনেকের কাছেই এ পুরস্কারটির গ্রহনযোগ্যতা আছে আবার অনেকের কাছেই তা বিতর্কিত। ডিনামাইটের মতো ধ্বংসাত্বক বস্তুর আবিষ্কারকের নামে এ শান্তি পুরস্কার প্রবর্তন করাটা একসময় উপহাসের বিষয়বস্তু ছিল।কিন্তু এর সমান্তরালে এটাও ঠিক যে এ পুরস্কার অনেক মানবহিতৈষী কাজকেও মূল্যায়ন করেছে এবং উত্‍সাহিত করেছে। আচ্ছা আসুন, দেখা যাক কিভাবে এ পুরস্কার বিবর্তিত হচ্ছেঃ
 হেনরি ডুনান্ট এর মতো ব্যক্তি, যার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি রেড ক্রস এর প্রতিষ্ঠাতা। ভদ্রলোক নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন 1901 সালে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে, (1865-1900) প্রায় 35 বছরের মানবহিতৈষী কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ পুরস্কার দেয়া হয়েছিলো। এটি নোবেল কমিটির স্বার্থকতা। এই স্বার্থকতার কাতারে আরো কিছু নাম যোগ করা যায়ঃ মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র,যার কর্মের স্বার্থকতা ও স্থায়ীত্ব বোঝার জন্য বারাক ওবামার নামটিই যথেষ্ট। আছেন মাদার তেরেসা, নেলসন ম্যান্ডেলা,নরম্যান বোরলগ, ইয়াসির আরাফাত যারা মানুষের কল্যান ও বিশ্বশান্তির জন্য তাদের সামর্থ্যের মধ্যে প্রায় সবটুকুই করেছিলেন এবং পুরস্কৃত হয়েছিলেন। ঠিক এদের পাশাপাশি রাজনৈতিক কারনে আরো কিছু মানুষের নাম নোবেল শান্তি পুরস্কারের তালিকায় আছে যারা তাদের কৃতকর্মের জন্য দুনিয়াজোড়া কুখ্যাত ছিলেন।সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী 'দ্য ডেভিলস এডভোকেট' খ্যাত হেনরি কিসিঞ্জার, ঈসরাইলের প্রধানমন্ত্রী শিমন পেরেজ, মোনাচেম বেগিন দের নাম নিশ্চয়ই সকলের পরিচিত। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো তারা কেউ এককভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হননি।নোবেল কমিটি 'শক্তির ভারসাম্য নীতি' বজায় রেখে 1973 সালে কিসিঞ্জারের সাথে ভিয়েতনামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লি ডাক থো এবং 1994 সালে শিমন পেরেজের সাথে ইয়াসির আরাফাত কেও এ পুরস্কার দেয়া হয়েছিলো সাময়িক যুদ্ধবিরতি ও শান্তিচুক্তিতে অবদান রাখার জন্য। আমি প্রশ্ন করছি না, কেন তারা নোবেল পেল? হ্যাঁ স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হলেও তারা কিছুটা সময়ের জন্যও কোন না কোন ভূখন্ডে স্থিরতা এনেছিলেন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, কেন তারাই পেলেন? যেখানে তাদের চেয়েও যোগ্য পুরস্কারপ্রার্থী ছিলেন। এখানেই আসে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টা আর এর সবচেয়ে ভালো উদাহরন টি বছর দুই আগের। আপনারা হয়তো অনেকেই জানেন না, 2015 সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনায় সবচেয়ে এগিয়ে ছিলো জাপান। ব্যক্তি জাপান নয়, দেশ জাপান। যদিও আলফ্রেড নোবেলের উইল অনুযায়ী কোন দেশকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করার নিয়ম ছিল না, জাপান বলতে মূলত এখানে জাপানের সংবিধানকে আর সংবিধানের মালিক হিসেবে সমগ্র জাপানবাসীকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য বিবেচিত করা হয়েছিল।এখানে একটু ঘটনার গভীরে যাওয়া প্রয়োজন। জাপানের সংবিধান যা বিশ্বে 'শান্তি সংবিধান' নামেই পরিচিত এর 9 নং ধারায় স্পষ্টতই উল্লেখ আছেঃ "জাপান কখনোই স্থল, সমুদ্র, ও বিমানবাহিনীসহ কোনরকম যুদ্ধশক্তির ভরনপোষন করবে না এবং রাষ্ট্রের যুদ্ধ করার অধিকার স্বীকার করা হবে না। " এ সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও শান্তিবাদী মানসিকতার জোড়ে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী 70 বছরের মধ্যে কোন দেশের সাথে কোনরূপ সংঘর্ষে জড়ায়নি যা অবশ্যই বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি মাইলফলক। সংবিধানের মালিক হিসেবে জাপানের জনগন বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় যে ভূমিকা পালন করে এসেছে, তা কেন নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হবে না? 2014 সালে এই ব্যাপারটি প্রথম মাথায় আসে এক জাপানী গৃহবধুর। তিনি নোবেল কমিটিকে চিঠি লিখে এ বিষয়টি সম্পর্কে তাদের অবগত করেন।নোবেল কমিটিরও বিবেচনায় আসে যে শান্তির জন্য জাপানী জনগনের এই সংগ্রাম অবশ্যই স্বীকৃতির দাবি রাখে। ঠিক ঐ সময়টাতেই দক্ষিন চীন সাগরকে কেন্দ্র করে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের উত্তেজনা দেখা দেয়, এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র জাপানের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র সবসময় নিজের কাধে নিলেও, চীন ও উত্তর কোরিয়ার ক্রমাগত শক্তিবৃদ্ধির ফলে কাজটি দিন দিন কঠিন হয়ে আসছিলো।ফলে নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং চীন ও উত্তর কোরিয়ার ক্রমাগত হুমকি মোকাবেলায় যাতে জাপানও যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সঙ্গী হতে পারে, সেজন্য 2015 সালে যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে চাপ দিয়ে জাপানের 70 বছরের পুরাতন 'শান্তি সংবিধানে' পরিবর্তন আনে। অর্থাত্‍ জাপান এখন থেকে বিশেষ প্রয়োজনে নিজ ভূখন্ডের বাইরে গিয়েও আক্রমন করতে পারবে।খুব সম্ভবত নোবেল কমিটিও যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ঐ বছর জাপানকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়নি কারন যে সংবিধানের কারনে নোবেল দেয়া হবে তা ঐ বছরই পরিবর্তন আনা টাকে বিশ্ববাসী সাংঘর্ষিক হিসেবেই দেখবে। ফলে রাজনৈতিক প্রভাবের কারনে জাপানবাসীর সৌভাগ্য হয়নি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার। এ পর্যন্ত এসে একটু থামুন। বিবর্তনটা দেখতে চান?

একটা সময় রাজনীতিবিদরা তাদের কাজের মূল্যায়ন হিসেবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেত। দীর্ঘসময় চলতে থাকা কোন যুদ্ধের সমাপ্তি টেনে বা সংঘর্ষ নিরোধ করে নোবেল পেত।তারপর একটু সাম্প্রতিকে আসুন, 2009 সালে বারাক ওবামার নোবেল প্রাপ্তির পেছনে উপরোক্ত কারনগুলোর কোন একটিও কি ছিলো? প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহনের মাত্র এক বছরের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, ইরাক যুদ্ধের সমাপ্তি টেনে ও সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষনা দিয়ে , এবং আরো নানারকম শান্তিবাদী প্রতিশ্রুতি আউড়েই তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন। প্রশ্ন করতে পারেন তিনি তো একটা যুদ্ধের সমাপ্তি টেনেছেন, তাহলে এর উত্তরটাও সহজ তিনি আসলে একটা যুদ্ধের সমাপ্তি টেনে আরেকটি যুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেই সৈন্য প্রত্যাহার করেছিলেন, আর মধ্যপ্রাচ্যে এখন কি পরিমান শান্তি বিরাজ করছে তা প্রায় সবার জানা।তারপর আসুন কয়েকদিন আগের ঘটনায় যাই, কট্টর মার্কসবাদী গেরিলা সংগঠন 'FARC' এর সঙ্গে একটি আপাত স্থায়ী কিন্তু গনভোটে প্রত্যাখিত শান্তিচুক্তিতে সফল হওয়ায় এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস।আমাদের নিশ্চয়ই জানা যে চুক্তি কখনো এক পক্ষের প্রচেষ্টায় হয়না এবং এর কৃতিত্বও এক পক্ষের না। কিন্তু বিবর্তনের ধারায় এবার এক পক্ষকেই সম্মানিত করা হয়েছে।তার উপর চুক্তির স্থায়ীত্বের প্রশ্নটি এসেই যায়। কলম্বিয়া সরকারের সাথে দেশটির অন্যান্য বিচ্ছিন্নতাবাদী ও মাদকচক্রের ইতিহাসটা আমাদের এটাই বলেঃ এখানে চুক্তি করা হয় চুক্তি ভঙ্গের জন্যই। কুখ্যাত মাদক সম্রাট পাবলো এসকোবার এর সাথেও নব্বইয়ের দশকে সরকারের কয়েকবার শান্তিচুক্তি হয়েছিলো যেগুলোর কোনটির স্থায়ীত্বও মাসখানেকের বেশি ছিলো না। কলম্বিয়ার জনগন ইতিহাসটা জেনেই হয়তোবা গনভোটে চুক্তিটিকে প্রত্যাখান করেছে। তবে আশা করবো এ দফায় শান্তিচুক্তিটি টিকে যাবে। তাহলে ব্যাপারটা এসে দাড়ালোঃ নোবেল শান্তি পুরস্কারে রাজনীতি প্রবেশ করলো, রাজনীতি পুরস্কারটিকে প্রভাবিত করলো, একসময় কাজের মূল্যায়নে নোবেল দেয়া হতো এখন আশাবাদ আর প্রতিশ্রুতি দিয়েও নোবেল পাওয়া যায় তাও আবার চুক্তির এক পক্ষকে। নরেন্দ্র মোদী বা নওয়াজ শরীফ যদি কাশ্মীর সীমান্ত হতে তাদের সৈন্যদের সরে আসতে বলে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়, দয়া করে অবাক হবেন না।


নাঈম হোসেন
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

No comments:

Post a Comment