নাইম হোসেন
সন্ধ্যা ৭ টা। নুরু মার্কেট। স্থানটি সাতকানিয়া উপজেলার খাগরিয়া ইউনিয়নের একটি স্থানীয় বাজার এবং এ উপজেলার অন্যতম সংঘাতময় স্থান। গ্রামের বাজারের সান্ধ্যকালীন পরিবেশ যেমনটা হয়: খোশগল্প,বাজার-সদাই,তর্ক সবকিছু চলছিলো অন্যান্য দিনের মতোই।হঠাত্ পাঁচ তরুন ও এক মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক (তাদের শিক্ষক) 'খালি মুড়ির টিন' ,ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষনা দেয়া শুরু করলোঃ নাটক! নাটক! নাটক! খাগরিয়া নিয়ে নাটক। প্রত্যন্ত এলাকার একটি বাজারে হঠাত্ এমন 'পথনাটকের ঘোষনা' দেওয়ায় মানুষ জড়ো হতে সময় লাগলো না। প্রায় শদুয়েক মানুষের সামনে এরপর শুরু হলো খাগড়িয়ার সামগ্রিক জীবনচিত্র নিয়ে নাটক 'ক্যানে চলর'। তার আগে ঘোষনা এলো নাটকের প্রতিটি অংশের মাঝে থাকবে ঐতিহ্যবাহী 'পুথিপাঠ'। বলার অপেক্ষা রাখে না এ পুথিটিও খাগরিয়া কেন্দ্রিক। যথারীতি পুথিপাঠ দিয়েই শুরুঃ
স্থান হিসেবে আমাদের খাগড়িয়াকে বেছে নেয়ার পেছনে কয়েকটি কারন ছিলো। একে তো এটি আমাদের প্রথম মিশন সুতরাং অভিজ্ঞতাশূন্য অবস্থায় খুব বড় কোন সমস্যার সমাধান করতে যাওয়াটা ঝুকির।তাই প্রথম মিশন হিসেবে তুলনামূলক আঞ্চলিক কোন সংঘাতের সমাধান করাটা হতো আমাদের জন্য সুবিধাজনক। তাছাড়া খাগড়িয়াকে বেছে নেয়ার আরেকটি ছোট কিন্তু উল্লেখযোগ্য কারনঃ সেখানে ছিলো আমাদেরই একজন কূটনীতিক রিদোয়ান আহমেদের গ্রামের বাড়ি। ঐ অঞ্চলটিকে ভালোভাবে চেনে এবং সেখানকার পরিচিত মুখ এমন একজনকে পাওয়ার সুবিধা তো ছিলোই এর পাশাপাশি আবাসিক সুবিধার বন্দোবস্ত হওয়াটাও আমাদের জন্য ছিলো বাড়তি পাওনা। খাগড়িয়ার শান্তি ক্যাম্প মিশনে আমরা ছিলাম ৬ জন মতিউল হক মাসুদ, রিদোয়ান আহমেদ, মোঃ আশিকুজ্জামান, অনিক দত্ত, মোশাররফ হোসেন এবং আমি। একজন শিক্ষক এবং পাঁচজন শিক্ষার্থী মিলে কিভাবে একটি অঞ্চলের সংঘাত দূর করবো,মানুষকে সচেতন করবো এবং আমাদের সফল হতে হলে কি কি করতে হবে এসব নিয়ে আমাদের কোন পূর্বপরিকল্পনা ছিলো না। কারন কূটনীতিতে সামনে এগোতে হয় পরিস্থিতি বুঝে, পরিস্থিতিই আপনাকে জানিয়ে দিবে আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ কি হওয়া উচিত। তাই আমরা কোন নির্দিষ্ট পূর্ব পরিকল্পনা করে যাইনি। আমাদের লক্ষ্য ছিলো যে করেই হোক গ্রামের মানুষের সাথে তাদের পর্যায়ে নেমে এসে মেশা, এবং কিছুতেই বুঝতে না দেয়া আমরা কোন বিশেষ লক্ষ্য নিয়ে সেখানে এসেছি। তবে কিছু সাংস্কৃতিক কার্যকলাপের মাধ্যমে তাদের সচেতন করার একটা ইচ্ছে আমাদের আগেই ছিলো। আমাদের কূটনৈতিক মিশনের নাম ছিলোঃ 'Young Diplomat's Peace Camp' এবং আমাদের স্লোগান ছিলোঃ
পরিশেষে অবশ্যই ধন্যবাদ জানাবো রিদোয়ান ভাইয়া এবং তার পরিবার কে। তাদের অান্তরিকতাই অামাদের শান্তি ক্যাম্পের সফলতায় বড় ভূমিকা রেখেছিলো।
সন্ধ্যা ৭ টা। নুরু মার্কেট। স্থানটি সাতকানিয়া উপজেলার খাগরিয়া ইউনিয়নের একটি স্থানীয় বাজার এবং এ উপজেলার অন্যতম সংঘাতময় স্থান। গ্রামের বাজারের সান্ধ্যকালীন পরিবেশ যেমনটা হয়: খোশগল্প,বাজার-সদাই,তর্ক সবকিছু চলছিলো অন্যান্য দিনের মতোই।হঠাত্ পাঁচ তরুন ও এক মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক (তাদের শিক্ষক) 'খালি মুড়ির টিন' ,ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষনা দেয়া শুরু করলোঃ নাটক! নাটক! নাটক! খাগরিয়া নিয়ে নাটক। প্রত্যন্ত এলাকার একটি বাজারে হঠাত্ এমন 'পথনাটকের ঘোষনা' দেওয়ায় মানুষ জড়ো হতে সময় লাগলো না। প্রায় শদুয়েক মানুষের সামনে এরপর শুরু হলো খাগড়িয়ার সামগ্রিক জীবনচিত্র নিয়ে নাটক 'ক্যানে চলর'। তার আগে ঘোষনা এলো নাটকের প্রতিটি অংশের মাঝে থাকবে ঐতিহ্যবাহী 'পুথিপাঠ'। বলার অপেক্ষা রাখে না এ পুথিটিও খাগরিয়া কেন্দ্রিক। যথারীতি পুথিপাঠ দিয়েই শুরুঃ
"শোনেন শোনেন গেরামবাসী শোনেন দিয়া মন, খাগরিয়ার কথা এখন করিব বর্নন"
খাগরিয়ার প্রাথমিক বর্ননা শেষেই শুরু হয় নাটক। নাটকের বিষয়বস্তু সহজঃ এক বিকালে নুরু মার্কেটে এক চায়ের দোকানে বসে তিন তরুনের মধ্যে কথা হচ্ছিলো। একজন বিদেশ ফেরত, একজন শহর থেকে আসা, অপরজন স্থানীয়। বিদেশ ফেরত তরুনটির কথায় আক্ষেপ; এই খাগরিয়া আর আগের মতো নাই। সপ্তাহখানেক হলো দেশে এসেছে অথচ এর মধ্যেই সংঘাতের কারনে দুটো মৃত্যুসংবাদ! এতো মারামারি ,হত্যা এসবের মধ্যে না থেকে সে বরং আবার বিদেশেই চলে যাবে। শহর থেকে গ্রামে আসা বন্ধুটির কন্ঠেও একই সুর। সে তো আর সাধে গ্রাম ছাড়েনি, জমিজমা নিয়ে এতো বিরোধের সাথে তাল মিলিয়ে গ্রামে আর কতদিন! আড্ডার মাঝে স্থানীয় বন্ধুটির ফোন আসে, কোথায় যেন কি নিয়ে ঝামেলা হইছে! কথা থামিয়ে হাতের কাছে যা পায় তা নিয়েই সে দৌড়। নাটকের আরেক অংশে দেখা যায়, রমিজ মিয়া এ খাগরিয়ার বাসিন্দা। তার সাথে জমিজমা নিয়ে পশ্চিম পাড়ার একজনের সাথে আগে থেকেই বিরোধ ছিলো। সেদিন বিকালে রমিজ মিয়া ও খবর পায় পশ্চিম পাড়ার কোথায় যেন জমি নিয়ে মারামারি লেগেছে, রমিজ মিয়াও ছুটে। তার আট বছরের ছেলে করিম মাকে এ কথা জানালে মা তার ছেলেকে পাঠায় বাবাকে ফিরিয়ে আনতে। বাবাকে আনতে গিয়ে ছোট ছেলেটি পড়ে যায় দুপক্ষের মারামারির মধ্যে। ফিরে আসে লাশ হয়ে। আট বছরের করিমের জানাজায় মারামারির পক্ষ-বিপক্ষের প্রায় সবাই আসে।সেখানেই রমিজ মিয়া সকলের কাছে হাতজোড় করে বলেঃ ' আজ আমার ছেলে মরছে, কাল হয়তো আপনাদের কারো ছেলে মরবে। আপনারা দয়া করে আর মারামারি কইরেন না, সামান্য জমিজমা নিয়ে বিরোধে আর কারো সন্তানকে যাতে মরতে না হয়। " ঐদিকে নাটকের পরপর পুথিও শেষ হয় এই বলেঃ
" জমির চেয়ে জীবন বড় একবার ভেবে দেখেন, মিলেমিশে সবাই গেরামে শান্তিতে থাকেন। "
![]() |
| Team YDC |
পুথি আর নাটকের পর শদুয়েক মানুষের প্রতিক্রিয়াই বলে দেয় তারা আসলে এতক্ষন নাটকের মধ্য দিয়ে তাদের গ্রামটিকে দেখছিলো আর পুথির মধ্য দিয়ে শুনছিলো। তরুনদের অভিনীত উপরের নাটকটির চরিত্র চিত্রন হয়তো কাল্পনিক কিন্তু খাগরিয়ার সামগ্রিক অবস্থা প্রচন্ডরকমের বাস্তব। উপরের পুরো কার্যকলাপটি ছিলো একটি শান্তি ক্যাম্পের অংশ। এবার আসুন এ "শান্তি ক্যাম্প" নিয়ে বলি। তার আগে জেনে রাখুন "Young Diplomat's Community" বা YDC সম্পর্কে, যে সংগঠনটি এই শান্তি ক্যাম্পের উদ্যোগটি নিয়েছিলো। প্রাথমিকভাবে সংগঠনটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে গঠিত। তরুন কূটনীতিকদের সংগঠন এর 'কূটনীতিক' শব্দটি শুনলে যে বড় পরিসরের ছবিটি আমাদের মনে আসে আমরা আসলে তা নই কিন্তু পরিসর ছোট হলেও আমরা আসলে তাই। আমরা হয়তো শুরুতেই বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারবো না কিন্তু দেশের অভ্যন্তরের ছোট বিবাদগুলোর অন্তত মীমাংসা করতে পারি এবং এর থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা থেকে নিজেদের তৈরী করতে পারি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জন্য। মূলত এই চিন্তা থেকেই আমাদের "Young Diplomat's Community" এর যাত্রা শুরু এবং এ চিন্তাটির চিন্তক আমাদেরই বিভাগের শিক্ষক মতিউল হক মাসুদ। এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন সমস্যা বা সংঘাতগুলোর সমাধান আবার বহুমাত্রিক। কিছু সমস্যার সমাধান সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া আপনি কিছুতেই সমাধান করতে পারবেন না। আবার কিছু সমস্যার মূলে গিয়ে যদি আপনি আঘাত করতে পারেন আর ঐ সমস্যার কারনে ভুক্তভোগীদের সচেতনতার মাধ্যমে এক করতে পারেন তাহলে তারাই হয়তোবা সমস্যাটির সমাধান করে ফেলতে পারে। আমরাও তেমনই একটি সংঘাতময় স্থান ও সম্যাস্যাক্রান্ত জনগোষ্ঠী বেছে নেই। আর এর মাধ্যমেই শুরু হয় আমাদের প্রথম কূটনৈতিক মিশন। স্থানঃ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার অন্তর্গত খাগরিয়া ইউনিয়ন।
স্থান হিসেবে আমাদের খাগড়িয়াকে বেছে নেয়ার পেছনে কয়েকটি কারন ছিলো। একে তো এটি আমাদের প্রথম মিশন সুতরাং অভিজ্ঞতাশূন্য অবস্থায় খুব বড় কোন সমস্যার সমাধান করতে যাওয়াটা ঝুকির।তাই প্রথম মিশন হিসেবে তুলনামূলক আঞ্চলিক কোন সংঘাতের সমাধান করাটা হতো আমাদের জন্য সুবিধাজনক। তাছাড়া খাগড়িয়াকে বেছে নেয়ার আরেকটি ছোট কিন্তু উল্লেখযোগ্য কারনঃ সেখানে ছিলো আমাদেরই একজন কূটনীতিক রিদোয়ান আহমেদের গ্রামের বাড়ি। ঐ অঞ্চলটিকে ভালোভাবে চেনে এবং সেখানকার পরিচিত মুখ এমন একজনকে পাওয়ার সুবিধা তো ছিলোই এর পাশাপাশি আবাসিক সুবিধার বন্দোবস্ত হওয়াটাও আমাদের জন্য ছিলো বাড়তি পাওনা। খাগড়িয়ার শান্তি ক্যাম্প মিশনে আমরা ছিলাম ৬ জন মতিউল হক মাসুদ, রিদোয়ান আহমেদ, মোঃ আশিকুজ্জামান, অনিক দত্ত, মোশাররফ হোসেন এবং আমি। একজন শিক্ষক এবং পাঁচজন শিক্ষার্থী মিলে কিভাবে একটি অঞ্চলের সংঘাত দূর করবো,মানুষকে সচেতন করবো এবং আমাদের সফল হতে হলে কি কি করতে হবে এসব নিয়ে আমাদের কোন পূর্বপরিকল্পনা ছিলো না। কারন কূটনীতিতে সামনে এগোতে হয় পরিস্থিতি বুঝে, পরিস্থিতিই আপনাকে জানিয়ে দিবে আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ কি হওয়া উচিত। তাই আমরা কোন নির্দিষ্ট পূর্ব পরিকল্পনা করে যাইনি। আমাদের লক্ষ্য ছিলো যে করেই হোক গ্রামের মানুষের সাথে তাদের পর্যায়ে নেমে এসে মেশা, এবং কিছুতেই বুঝতে না দেয়া আমরা কোন বিশেষ লক্ষ্য নিয়ে সেখানে এসেছি। তবে কিছু সাংস্কৃতিক কার্যকলাপের মাধ্যমে তাদের সচেতন করার একটা ইচ্ছে আমাদের আগেই ছিলো। আমাদের কূটনৈতিক মিশনের নাম ছিলোঃ 'Young Diplomat's Peace Camp' এবং আমাদের স্লোগান ছিলোঃ
' জমির চেয়ে জীবন বড়, মারামারি ছেড়ে সহযোগীতা কর'
তো এই স্লোগানকে সঙ্গী করেই আমরা রওনা দেই সাতকানিয়ার উদ্দেশ্যে। যার যার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বাইরে আমাদের সাথে ছিলোঃ YDC র স্লোগান লেখা একটি ব্যানার, গ্রামের বাচ্চাদের জন্য কিছু খাবারদাবার আর একটি 'শান্তির সাদা পতাকা'। দুই ঘন্টার মধ্যে সাতকানিয়া পৌছে আধঘন্টার বিরতি নিয়েই আমরা কাজে নেমে পড়ি।ও হ্যাঁ তার আগে বলে নেই, আমরা উঠেছিলাম খাগড়িয়ার আকবরপাড়া নামক স্থানে। খাগড়িয়ার যে দুই 'পাড়া'র মধ্যে মূল সংঘাত এই এলাকাটি তার মাঝে অবস্থিত। অর্থাত্ আকবরপাড়া হলো খাগড়িয়ার 'বাফারস্টেট'। তো সন্ধ্যায় পৌছেই আমরা বেরিয়ে পড়ি এবং যতক্ষন পর্যন্ত দোকানপাট খোলা ছিলো আমরা বাইরেই ছিলাম। আমরা প্রায় প্রতিটা দোকানেই থেমেছি, প্রতিটি মানবজটলার সাথে কথা বলেছি। কয়েকঘন্টার মধ্যে অনেকের সাথে কথা বলে খাগড়িয়া নিয়ে আমরা একটি প্রাথমিক ধারনা পেয়ে গিয়েছিলাম। খাগড়িয়ার মোট ৬ টি ওয়ার্ডের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তীব্র বিরোধ আছে '৩ নং' এবং '৬ নং' এ দুটো ওয়ার্ডে। ৩ নং ওয়ার্ডে যে দুটি গ্রুপের মধ্যে বিরোধ তারা হলোঃ জামাল গ্রুপ এবং কবির মেম্বার গ্রুপ। আর এই দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের কেন্দ্রস্থল হলো পশ্চিমপাড়ার 'নুরুমার্কেট' নামক স্থানীয় একটি বাজার।অন্যদিকে ৬ নং ওয়ার্ডের বিবাদমান দুটো গ্রুপ হলোঃ মুসা গ্রুপ এবং বাদশাহ গ্রুপ।আর তাদের সংঘর্ষের কেন্দ্রস্থল হল 'সাগারচর' নামক স্থান। তাছাড়া বিভিন্ন লোকের সাথে কথা বলে যা বুঝলাম তাতে মনে হলোঃ খাগড়িয়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আকতার হোসেন এবং সাবেক চেয়ারম্যান জসীম উদ্দীনের মধ্যে সম্পর্কটা বেশ শীতল। তবে খাগড়িয়া নিয়ে একটি কথা না বললেই নয়, এ ইউনিয়নটি সংঘাতের জন্য পরিচিত হলেও এসব সংঘাতে সংশ্লিষ্ট মানুষের সংখ্যা খুবই কম। খাগড়িয়ার ৯৫% মানুষই পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে এসব দ্বন্দায়মান গ্রুপগুলোর কোন একটিকে সমর্থন করতে বাধ্য হয়। কারন কেউ যদি এই দুই গ্রুপের বাইরে গিয়ে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করে তাকে গ্রামের অন্যান্যরা দৃশ্যত 'একঘরে' করে রাখে। আমরা একটি ঘটনা শুনেছিলাম এক যুবকের কাছ থেকে, গত ঈদ-উল-আযহায় পশ্চিমপাড়ার এক ব্যক্তি যিনি দুই গ্রুপের কোনটাকে সমর্থন করেন না তার গরু কুরবানের পর মাংস কাটার জন্য একজন মানুষও তাকে সাহায্য করতে আসে নি। পুরো গ্রামের পরিস্থিতি মোটামুটি বোঝার পর ঐ রাতে আমরা পরের দিনের জন্য কিছু লক্ষ্য ঠিক করি। যারা সংঘর্ষের সাথে জড়িত তাদের যেহেতু বোঝানো কঠিন, তাই আমরা ঠিক করি যারা ভুক্তভোগী তাদেরকে এসবের অপকারীতা সম্পর্কে সচেতন করবো এবং যারা নিরপেক্ষ তাদেরকে এক করে তাদের অবস্থানটা গ্রামে আরো শক্তিশালী করবো। সৌভাগ্যক্রমে এর পরদিন বিবাদমান মুসা গ্রুপ এবং বাদশাহ গ্রুপের মধ্যে সাগারচরের একটি রাস্তার বিরোধকেন্দ্রিক সালিশ ছিলো। আমাদের পরিকল্পনা ছিলো ঐ সালিশে আমাদের গুরুত্বপূর্ন অবস্থানটা জানান দেয়া। যাই হোক পরদিন সকালের সালিশে আমরা পর্যবেক্ষকের ভুমিকায় থাকি এবং ঐ বিরোধ মীমাংসায় আমাদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে। এরপর আমরা যাই সমগ্র খাগড়িয়ার সবচেয়ে বিরোধপূর্ন স্থান নুরুমার্কেটে।খাবার হোটেল, চায়ের দোকানের পাশাপাশি মানুষের জটলা আছে এমন প্রায় সব স্থানেই আমরা মানুষের সাথে কথা বলেছি।এরপর নুরুমার্কেট থেকে আমরা যাই গ্রামের আরেকপ্রান্তের 'ভোরবাজারে'। যাওয়ায় পথে কথা হয়েছে গ্রামের এমন দুএকজনের কথা বলতেই হয়। বিদেশ থেকে আসা এক যুবক বললো, 'পাঁচ বছর আগে এক মারামারিতে আমার বাবা মারা যায়'।এক বৃদ্ধা বললো, ' আমি আমার মেয়েকে বিয়ে পর্যন্ত দিতে পারছি না, আমাদের পরিবারের নাম মারামারিতে যুক্ত থাকায় কেউ আমাদের পরিবারের কাছে তার ছেলেকে বিয়ে দিতে চায় না'। খাগড়িয়াবাসীকে সচেতন করার জন্য তাদের গ্রামেরই এমন বাস্তব কিছু উদাহরন আমাদের দরকার ছিলো। ঐদিন ভোরবাজার হয়ে আমরা বাড়িতে চলে আসি এবং খাগড়িয়াবাসীকে সচেতন করার জন্য সবাই মিলে তৈরী করি একটি নাটক আর এর প্লট তৈরী করে আমাদের কূটনীতিক আশিকুজ্জামান অন্যদিকে আমাদের শিক্ষক মতিউল হক মাসুদ লিখেন একটি পুথি। এরপর আমরা শুরু করি রিহার্সেল।এর সাথে আমরা ঠিক করি এই নাটকটি আমরা করবো নুরুমার্কেটে। রিহার্সেল শেষে আমরা বিকালে আবার বের হই । খাগড়িয়ার প্রান শঙ্খ নদীতে নৌকাভ্রমন শেষ করে সন্ধ্যায় আমরা আবার যাই নুরু মার্কেটে। মানুষের সাথে গল্পগুজব করি আর গানবাজনা করি তবে মানুষকে নিছক আনন্দ দেয়ার জন্য না।
যেহেতু এই অঞ্চলে আমরা একেবারেই নতুন আর তাছাড়া আমাদের পরিকল্পনা ছিলো এ বাজারে একটি নাটক করা, তাই আমরা ঐদিন রাতে গানবাজনা করে পরেরদিনের প্লট তৈরি করছিলাম।বাজারের মানুষজন যাতে পরেরদিন আমাদের সহজভাবে নেয়। এরপর দিন সকালে আমরা যাই খাগড়িয়ার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ স্কুল 'খাগড়িয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে'। আমাদের ইচ্ছে ছিলো বাচ্চাদের সাথে নিজেদের মতো করে সময় কাটানো এবং তাদেরও সচেতন করা যেহেতু তারাই পরবর্তীতে তাদের গ্রামকে নেতৃত্ব দিবে। কিন্তু স্কুলে গিয়ে অভিজ্ঞতা হয় ভিন্ন, আমরা ভেবেছিলাম বাচ্চাদের সাথে সহজভাবে মিশবো কিন্তু স্কুলের শিক্ষকরা একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে পেয়ে প্রতিটা ক্লাসরুমে তাকে দাড় করিয়ে দেয় বাচ্চাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার জন্য।যাই হোক অন্যভাবে হলেও বাচ্চাদের নিয়ে আমাদের উদ্দেশ্য যে সফল ছিলো। দুপুর পর্যন্ত স্কুলে কাটিয়ে বাড়িতে এসে বিকাল পর্যন্ত আমরা নাটক আর পুথির রিহার্সেল করি। এরপর সন্ধ্যায় আমরা আবার যাই নুরু মার্কেটে। কিছুক্ষন গল্পগুজবের আসে সেই প্রতিক্ষীত সন্ধ্যা ৭ টা। নাটকের পর বাজারের মানুষরা আমাদের সাথে কথা বলে, তাদের সমর্থন আর কিছু আফসোস আমাদের আশাবাদী করেছিল। তাদেরই একজন বলছিলো, যদি আমাদের গ্রামের কোন সংগঠন মারামারির বিরুদ্ধে এমন কিছু আগে করতো, তাহলে হয়তো এ ব্যাপারগুলো আমরা আরো আগে বুঝতাম। যাইহোক আমাদের প্রায় সব পরিকল্পনা সফল হলেও সাথে আনা শান্তির সাদা পতাকাটাকে নিয়ে পরিকল্পনা সফল হয়নি। ভেবেছিলাম সাদা পতাকাটি খাগরিয়াতে উড়িয়ে দিয়ে যাবো।এবারের মতো সাদা শান্তি পতাকাটি হয়তো উপযুক্ত পরিস্থিতির অভাবে উড়িয়ে যেতে পারিনি,তবে ভবিষ্যতে অশান্তি আর সহিংসতাময় স্থানগুলোতে আমরা আরো অনেক শান্তি পতাকা উড়িয়ে দিয়ে আসবো।
যেহেতু এই অঞ্চলে আমরা একেবারেই নতুন আর তাছাড়া আমাদের পরিকল্পনা ছিলো এ বাজারে একটি নাটক করা, তাই আমরা ঐদিন রাতে গানবাজনা করে পরেরদিনের প্লট তৈরি করছিলাম।বাজারের মানুষজন যাতে পরেরদিন আমাদের সহজভাবে নেয়। এরপর দিন সকালে আমরা যাই খাগড়িয়ার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ স্কুল 'খাগড়িয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে'। আমাদের ইচ্ছে ছিলো বাচ্চাদের সাথে নিজেদের মতো করে সময় কাটানো এবং তাদেরও সচেতন করা যেহেতু তারাই পরবর্তীতে তাদের গ্রামকে নেতৃত্ব দিবে। কিন্তু স্কুলে গিয়ে অভিজ্ঞতা হয় ভিন্ন, আমরা ভেবেছিলাম বাচ্চাদের সাথে সহজভাবে মিশবো কিন্তু স্কুলের শিক্ষকরা একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে পেয়ে প্রতিটা ক্লাসরুমে তাকে দাড় করিয়ে দেয় বাচ্চাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার জন্য।যাই হোক অন্যভাবে হলেও বাচ্চাদের নিয়ে আমাদের উদ্দেশ্য যে সফল ছিলো। দুপুর পর্যন্ত স্কুলে কাটিয়ে বাড়িতে এসে বিকাল পর্যন্ত আমরা নাটক আর পুথির রিহার্সেল করি। এরপর সন্ধ্যায় আমরা আবার যাই নুরু মার্কেটে। কিছুক্ষন গল্পগুজবের আসে সেই প্রতিক্ষীত সন্ধ্যা ৭ টা। নাটকের পর বাজারের মানুষরা আমাদের সাথে কথা বলে, তাদের সমর্থন আর কিছু আফসোস আমাদের আশাবাদী করেছিল। তাদেরই একজন বলছিলো, যদি আমাদের গ্রামের কোন সংগঠন মারামারির বিরুদ্ধে এমন কিছু আগে করতো, তাহলে হয়তো এ ব্যাপারগুলো আমরা আরো আগে বুঝতাম। যাইহোক আমাদের প্রায় সব পরিকল্পনা সফল হলেও সাথে আনা শান্তির সাদা পতাকাটাকে নিয়ে পরিকল্পনা সফল হয়নি। ভেবেছিলাম সাদা পতাকাটি খাগরিয়াতে উড়িয়ে দিয়ে যাবো।এবারের মতো সাদা শান্তি পতাকাটি হয়তো উপযুক্ত পরিস্থিতির অভাবে উড়িয়ে যেতে পারিনি,তবে ভবিষ্যতে অশান্তি আর সহিংসতাময় স্থানগুলোতে আমরা আরো অনেক শান্তি পতাকা উড়িয়ে দিয়ে আসবো।
নাইম হোসেন
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ।


No comments:
Post a Comment