Saturday, April 11, 2020

করোনা ভাইরাসের আন্তর্জাতিক রাজনীতিঃ যে ৫ টি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে বিশ্ব!

ক্ষুদ্র একটি বিশ্ব আজ সারা বিশ্বকে স্থম্ভিত করে দিয়েছে, যার নাম করোনা বা কোভিড-১৯। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবকিছু থেমে গেলেও থেমে নেই বিতর্ক। করোনা আসলে কী, এটি কি নিছক একটি জীবাণু নাকি অন্য কিছু! এর পেছনে কি কোন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এর কারসাজি আছে? ভবিশ্ষ্যতে কি এই ধরনের ভাইরাস আবারো হানা দেবে?এই ধরনের নানান প্রশ্ন ভেসে বেড়াচ্ছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। আজ আমরা এই ধরনের ৫ টি প্রশ্নের উত্তর খোজার চেষ্টা করবো যা করোনা পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে আরো উষ্ণ করে তুলেছে।

Saturday, April 4, 2020

অনিরাপত্তার বিশ্বায়ন ও রাষ্ট্রের সংকট

"বিশ্বায়ন" শব্দটির সাথে আমরা অনেকেই পরিচিত। বর্তমান বিশ্বের প্রায় প্রতিটি মানুষ-ই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিশ্বায়নে সংযুক্ত। পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে মানুষে মানুষে সংযুক্তি, তড়িৎ যোগাযোগ ব্যবস্থা, মুক্তবাজার ব্যবস্থা, তথ্যপ্রবাহ - সবকিছু মিলিয়ে আমরা আজ বিশ্বগ্রাম (global village) এর বাসিন্দা।



বিশ্বায়নের শুরু সেই অনাদিকাল থেকে। সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই মানুষ পরিভ্রমণ করেছে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে; কখনো অজানাকে জানার আগ্রহে আবার কখনো বা আত্মরক্ষার্থে। একটা সময় মানুষ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো গোলকজুড়ে। দেশ থেকে মহাদেশে বাণিজ্য করতে শুরূ করলো। ধর্ম প্রচারে ভ্রমণ করলো দেশ দেশান্তর। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতা এই পথ-পরিক্রমাকে ত্বরান্বিত করলো গত শতকে। আজকের শতকে আমরা বিশ্বায়নের শিখরে দাড়িয়ে। প্রশ্ন জাগে- এই বিশ্বায়ন কি শুধুই জ্ঞান-বিজ্ঞান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ সংযুক্তি নাকি মুদ্রার অপর পিঠে আরো কিছু ঘটে চলেছে। অর্থনীতির বিশ্বায়নে কি সকলে সমান সুফল লাভে করছে, নাকি পুঁজিবাদের শিকড় বিস্তৃত হচ্ছে। সংষ্কৃতির বিনিময় বেড়েছে, নাকি পপুলার কালচারে হারিয়ে যাচ্ছে দেশজ ও স্থানীক কৃষ্টি। এই বিশ্বায়ন কি পৃথিবীকে নিরাপদ, নাকি আরো বেশি অনিরাপদ করেছে- বেড়েছে অপরাধীদের যোগাযোগ।
সর্বশেষ যে প্রশ্নটি আমাদের আসামীর কাঠগড়ায় দাড় করিয়েছে তা হলো, এই বিশ্বায়ন কি রোগ-ব্যাধি-সংক্রমণের বিশ্বায়ন নয়? করোনা বা কোভিড-১৯ নামক এক প্রাণঘাতী ভাইরাস এর বিশ্বভ্রমণ বিশ্বায়নের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শুধু তাই নয়, প্রশ্নটা জোরালো হয়েছে যে, অনিরাপত্তার বিশ্বায়নের (globalization of insecurity)  জন্য কি আমরা প্রস্তুত?

Monday, March 30, 2020

জীবাণু অস্ত্র কী এবং কিভাবে প্রয়োগ করা হয়?

প্রাচীনকাল থেকেই মানব সমাজে অস্ত্রের ব্যবহার হয়ে আসছে। অস্ত্রের ব্যবহার কখনো বা শিকার এর কাজে, কখনো বা আত্মরক্ষায় আবার কখনো বা শত্রুকে ঘায়েল করতে ব্যবহৃত হতো। জ্ঞান-বিজ্ঞান এর প্রসারের সাথে পাল্লা দিয়ে অস্ত্রের কৌশলও আধুনিক হতে থাকে। আবার কেউ কেউ নিছক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করতে গিয়ে আবিষ্কার করে ফেলেন, যেমনটি দেখি আলফ্রেড নোবেল এর ক্ষেত্রে। তার আবিষ্কৃত ডিনামাইট অস্ত্রের উপাদানকে আরো ভয়াবহ করে তোলে। পরবর্তীতে এই ঘটনা তাকে খুবই অনুতপ্ত করে তোলে, তিনি তার অর্জিত সব অর্থ মানব কল্যানে নিয়োজিত করার সংকল্প গ্রহন করেন। তার নামেই চালু হয় নোবেল প্রাইজ। কিন্তু তার এই উদ্যোগ অস্ত্রের ব্যবহার রোধ করতে পারেনি।

বিশ্বব্যাপী অস্ত্রের উৎপাদন যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি আজকের দিনে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও রাশিয়ার মতো দেশের জন্য অস্ত্র একটি বড় বাণিজ্য। এই কাতারে যোগ দিয়েছে চীন। বিশ্বরাজনীতির গতিপ্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে অন্যতম একটি ভূমিকা রাখে অস্ত্র বাজার। দেশে দেশে সংঘাত- সংঘর্ষ বৃদ্ধির নেপথ্যে আছে অস্ত্র ব্যাবসায়ীদের কূটচাল। অশান্ত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এই অস্ত্রের খেলা আমরা দেখি বরাবরই।

কিন্তু অস্ত্রের আবিষ্কারক ও ব্যবহারকারী মানব জাতির অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলেছে এই অস্ত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমানবিক অস্ত্রের প্রয়োগ মানব জাতির ইতিহাসে একটা ভয়ংকর ঘটনা। হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহর মুহুর্তেই ধূলোয় ধুসর হয়ে গিয়েছিল "লিটল বয়" ও "ফ্যাটম্যান" নামক দুটো পারমানবিক বোমার আঘাতে।এরপরও থেমে থাকেনি অস্ত্রের ব্যবহার। একে একে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, ভারত, পাকিস্তান, ইসরাইল ও উত্তর কোরিয়া পারমানবিক বোমার তৈরি করে। ইরানও পারমানবিক বোমার অধিকারী বলে ধারনা করা হয়।

এখানেই শেষ নয়; উৎপাদিত হয়েছে রাসায়নিক বোমা ও জীবাণু বোমা। রাসায়নিক গ্যাস আকারে ব্যবহার করা রাসায়নিক বোমা সিরিয়ার লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে। আর এর সর্বশেষ সংযোজন হলো জীবাণু অস্ত্র (biological weapons)। কিন্তু কী এই জীবাণু অস্ত্র? করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ এর ভয়াবহ ব্যপকতার পর প্রশ্নটি বারবার আলোচিত হচ্ছে যে করোনা একটি জীবাণু অস্ত্র কি না। তার আগে জেনে নেই জীবাণু অস্ত্র কীঃ

Friday, March 27, 2020

করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) বিশ্বব্যবস্থায় কী কী পরিবর্তন আনবে?

 এই মুহুর্তে বিশ্বের প্রায় ১৭০ দেশ করোনা ভাইরাস এ আক্রান্ত। এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি বিরাজমান সমগ্র বিশ্বে। এমনকি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও উন্নত রাষ্ট্রগুলো পর্যন্ত নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছে করোনা মোকাবেলায়। ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ সবকিছু স্থবির। এসবের মাঝে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে এই পরিস্থিতি পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে। সার্বিক দিক বিবেচনায় দুটো দিক বলা উল্লেখ করা যায়ঃ

১. আগামী দিনগুলোতে নিরাপত্তার ধারনা পর্যালোচনা করতে হবে নতুন আঙ্গিকে।

২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান থেকে করোনা তথা বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

Wednesday, March 25, 2020

করোনা ভাইরাস কি জৈব অস্ত্র?

এই মুহুর্তে সমগ্র বিশ্বের আতংকের নাম করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯)। চীনের হুবেই প্রদেশের উহান যার উৎপত্তিস্হল। দ্রুত বিস্তার লাভ করা এই ভাইরাস এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে বিশ্বব্যাপী। প্রশ্নের সুম্মুখীন করেছে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সহ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বৈশ্বিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন এর আশংংকা করছেন। আবারো ফিরে এসেছে "জৈব- অস্ত্র" বা Bioterrorism এর আলোচনা।


ওয়াশিংটন টাইমস এর একটি রিপোর্ট এ ইতোমধ্যে বলা হয়েছে যে চীন উহান প্রদেশের একটা গবেষনাগারে জীবানু-অস্ত্র উৎপাদন করছিল এবং দুর্ঘটনাবশতঃ সেখানেই করোনা বিস্তার লাভ করে। আবার পাল্টা আলোচনায় বলা হচ্ছে যে, পরাশক্তি আমেরিকায় নিজেই চীনকে ঘায়েল করার জন্যই জীবানু অস্ত্রের আশ্রয় নিয়েছে। কেননা ইতোপূর্বে বাণিজ্যযুদ্ধে চীন তার শক্তিমত্তা প্রদর্শন করেছে। 

দুটো আলোচনারই দুর্বল দিক আছে। চীনের দুর্বল দিক হলো এর কর্তৃত্তবাদ, চীনের তথ্যপ্রবাহ অবাধ নয়। যেকারনে তার দাবী প্রশ্নের সম্মুখীন। অন্যদিকে আমেরিকাও অন্যতম মিডিয়া ব্যবসায়ী, মিডিয়া তার প্রপাগাণ্ডা প্রবাহের অন্যতম হাতিয়ার। 

সবশেষে এই ব্যপারে সুষ্পষ্ঠভাবে বলা যায় যে আগামী দিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় জৈবাস্ত্র একটি বরাট ভূমিকা পালন করবে। তথাকথিত নিরাপত্তা ও উন্নয়নের কার্যকারিতাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে করোনা বা কোভিড-১৯। জৈব নিরাপত্তা, পরিবেশগত নিরাপত্তা ও টেকসই নিরাপত্তার ধারনা আলোচনার দাবী রাখবে আগামী দিনে। 



সম্পাদক, আন্তর্জাতিক অঙ্গন 
Editor, International Affairs                          


               

Wednesday, November 28, 2018

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে যা পড়ানো হয়

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক একাডেমিক বিষয় হিসেবে অত্যন্ত সময়োপযোগী। দেশে ও বিদেশে প্রতিনিয়তই এর প্রয়োজনিয়তা বাড়ছে। কারন বর্তমান বিশ্বকে জানতে এবং এর নেতৃত্ব লাভ করার প্রয়াসে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জানার বিকল্প নেই। কী পড়ানো হয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কে?
আন্তর্জাতিক সম্পর্কে পড়ে একজন শিক্ষার্থী সমগ্র বিশ্বকে জানতে পারে নতুন দৃষ্টিভংগী থেকে। জানতে পারে এর চালিকা শক্তি। নেতৃত্ব কৌশল।

পড়ুন জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীঃ সাফল্য ব্যর্থতার খতিয়ান


চলুন দেখা যাক এমন কয়েকটি বিষয় যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কে পড়ানো হয়।

১. আন্তর্জাতিক আইনঃ এই বিষটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম কোর্স। এই কোর্স এ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিধানে কী কী আইনগত বিষয় রাষ্ট্র মেনে চলে তা জানা যায়। যেমন যুদ্ধ বিষয়ক আইন, মানবাধিকার আইন, সমুদ্র আইন ইত্যাদি।

২. আন্তর্জাতিক সংগঠনঃঃ আন্তর্জাতিক সংগঠনের গঠনপ্রণালী, মূলনীতি জানবেন এই কোর্স এ। জানবেন বিভিন্ন প্রকারভেদ ও এর কার্যাবলী।

৩.  শান্তি ও সংঘর্ষঃ চমৎকার একটি কোর্স। জানা যায় কিভাবে সংঘর্ষ এড়িয়ে শান্তিপ্রক্রিয়া রক্ষা করা যায়।

৪. কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিঃ জানবেন কূটনৈতিক কলাকৌশল ও ইতিহাস। আরো জানবেন পররাষ্ট্রনীতি প্রনয়নে কী কী নিয়ামক কাজ করে ইত্যাদি।

৫. বৈশ্বিক রাজনৈতিক অর্থনীতিঃ জানবেন বৈশ্বিক অর্থনীতি এ গতিপ্রকৃতি। বানিজ্যনীতি ও এর কলাকৌশল ইত্যাদি।

এভাবেই আন্তর্জাতিক সম্পর্কে পড়াশোনার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী বিশ্ব সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করেন।

শরীফ মুস্তাজীব
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

                                                             

Friday, November 16, 2018

পরিবেশ বনাম উন্নয়নঃ প্রসঙ্গ রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প

মানব মস্তিষ্কের ক্রমবিকাশের সাথে সাথে মানুষ প্রকৃতিকে ব্যবহার করতে শিখেছে । ক্রমশ শিখেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আত্মরক্ষা করতে । নিত্যনতুন আবিষ্কার মানুষকে দিয়েছে বিস্ময়কর এক গতিশীলতা । শিল্পবিপ্লবের প্রক্কালে মানবজাতি পদার্পণ করেছে যান্ত্রিকশিল্পের এক নতুন অধ্যায়ে । এরই ধারাবাহিকতায় আজকের একবিংশ শতাব্দীর চরম উৎকর্ষতা । জ্ঞানবিজ্ঞানের এই অভূতপূর্ব সাফল্যে মানবজাতির কাছে পৃথিবীর সকল উদ্ভিদরাজি ও প্রাণীকুল মাথা নত করেছে । প্রাচীনকালের সেই মানুষ আজ হিংস্র হায়েনার ভয়ে ভয়ার্ত নয় । কিন্তু প্রকৃতি ও পরিবেশের উপাদানের যথাযোগ্য ব্যাবহার (optimum level)  অতিক্রম করে মানুষ আজ নিজেই নিজের জন্য হুমকি !

সাম্প্রতিককালের “উন্নয়ন” ধারণা এক্ষেত্রে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব রাখে । উন্নয়নের পুঁথিগত ধারণা কিংবা অর্থনীতির সাধারণ আলোচনায় পণ্য সংস্কৃতির প্রভাব দেখি যেখানে তামাকজাত বা এ জাতীয় উৎপাদনকেও আয় বলে গণ্য করা হয় । মূলত উন্নয়ন ও পরিবেশের মুখোমুখি অবস্থান এখানেই । উন্নয়নের বাণিজ্যিক প্রচারে যুদ্ধও নিশ্চয় লাভজনক ব্যবসা !



পরিবেশ সুরক্ষায় কেউ কথা বললেই পুঁজিপতি ও শিল্পমালিকশ্রেণী তাদের উন্নয়নবিরোধী অপবাদ দিয়ে থাকেন । আসলে তারা পরিবেশ ও উন্নয়নের প্রকৃত সম্পর্ক যে পরস্পর বিরোধী নয়; তা এড়িয়ে যান । উদাহরণস্বরূপ আমরা জাতীয় আয়ের ধারণার অসম্পূর্ণতা বিবেচনা করতে পারি । একটি দেশের মোট উদ্ভিদরাজি যে পরিমাণ অক্সিজেন উৎপাদন করে (যাকে ইংরেজিতে বলা হয় Less-tangible )  তা কি আর্থিক হিসেবে রাখা হয় ? অথচ গাছ কেটে যে কাঠ উৎপাদন করা হয় তার বাজারমূল্যকে আয় বলে বিবেচনা করা হয় !

পরিবেশ ও উন্নয়নের প্রকৃত সম্পর্ক নির্ণয়ে অন্যতম বড় সমস্যা পরিবেশের সার্বজনীনতা । পরিবেশের উৎপাদন রাষ্ট্রীয় সীমানা মেনে চলে না । ফলে, বরাবরই শিল্পোন্নত দেশগুলোর কর্মফল সমগ্র বিশ্বকে সমভাবে ভোগ করতে হচ্ছে ।  পরিবেশের প্রতি তাদের নির্বিচার কার্যাবলীর দায়ভার পড়ছে সবার উপর ।  বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণের শতকরা ২৫ ও ১৪ নিঃসরণ করে যথাক্রমে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র । যার অনিবার্য ফলাফল ফলাফল ভোগ করছে স্বল্পোন্নত দেশগুলো।
অপরদিকে আমরা যতই টেকসই উন্নয়নের কথা বলি না কেন, প্রকৃত উন্নয়নে আমাদের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতাই আসল । এক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দায়ভার এড়াতে পারে না, প্রয়োজন নিজেদের উন্নয়নে পরিবেশগত দিক সর্বোচ্চ লক্ষ্য রাখা । অবশ্যই উন্নয়নের বিশ্বজনীন ধারণাকে সামনে রাখা অপরিহার্য । উন্নয়নের এই পরিবেশগত ও বিশ্বজনীন দিক বিবেচনায় না রাখার ফলে বিশ্বব্যাপী এ উন্নয়ন অসম ও অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়ছে যা ক্রমশ বুমেরাং হয়ে ফিরে আসবে পুরো মানব সভ্যতার উপর ।

১৯৭২ সালের স্টকহোম সম্মেলনের পর নব্বই দশকের দিকে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের পরিবেশ ভাবনা বেশ আশাজাগানিয়া ছিল যা ক্রমশ হতাশাব্যঞ্জক হয়ে পড়ছে তাদের স্বার্থবাদী নীতির ফলে । কিয়েটো প্রোটকলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ স্থিমিত হয়ে পড়েছে শিল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থান্বেষী মনোভাবেতবে প্রোটোকলের ১৮ তম অনুচ্ছেদের “কার্বন ট্রেডিং” একটি চমৎকার ধারণা যা উন্নয়ন ও পরিবেশের গঠনমূলক সম্পর্কের যুগপৎ ভিত্তি রচনা করে । কার্বন ট্রেডিং বলতে বলা হয়েছে কোন প্রতিষ্ঠানকর্তৃক নির্গত কার্বনের সমানুপাতে কার্বন শোষণ করার প্রাকৃতিক ব্যবস্থা । ধরা যাক কোন প্রতিষ্ঠান ১০০ টন কার্বন নির্গত করছে । অতএব এ প্রতিষ্ঠানকে ঐ ১০০ টন কার্বন শোষণ করে এমন পরিমাণ বৃক্ষ রোপণ করতে হবে । আমরা এ ধরনের উদ্ভাবনী পরিবেশগত উন্নয়নে ফলপ্রসূ হতে পারে ।




এবার বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন নিয়ে পরিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক যে বিতর্ক চলছে তার আলোকপাত করা যাক । সন্দেহ নেই, একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি সময়ের দাবী । অপরদিকে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনও বাংলাদেশের অস্তিত্বের অপরিহার্য উপাদান । সুন্দরবনকে বলা হয় বাংলাদেশের ফুসফুস । এখানেও ঠিক পরিবেশকে উন্নয়নের মুখোমুখি দাড় করানো হয়েছে । প্রকল্পের আনুষঙ্গে এটা সহজবোধ্য যে এই প্রকল্পে স্বচ্ছতার অভাব যথেষ্ট



বাংলাদেশের ইআইএ (Environmental Impact Assessment) প্রতিবেদন অনুসারেই প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকার ১০ কিমি ব্যাসার্ধের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রয়েছে ৭৫ শতাংশ কৃষি জমি, যেখানে বছরে ৬২ হাজার ৩৫৩ টন ধান এবং ১ লাখ ৪০ হাজার ৪৬১ টন অন্যান্য শস্য উৎপাদিত হয়। গরান (ম্যানগ্রোভ) বনের সঙ্গে এই এলাকার নদী ও খালের সংযোগ থাকায় এখানে বছরে ৫,২১৮ দশমিক ৬৬ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়ন করতে গেলে প্রকল্প এলাকার ফসল ও মৎস্য সম্পদ উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তথাপি প্রকল্পের জন্য ১৮৩৪ একর কৃষি, মৎস্য চাষ ও আবাসিক এলাকার জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যার ৯৫ শতাংশই তিনফসলি কৃষি জমি, যেখানে বছরে ১২৮৫ টন ধান ও ৫৬৯ দশমিক ৪১ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। এই ধান-মাছ উৎপাদন বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে এখন প্রায় ৮ হাজার পরিবার উচ্ছেদ হবে, যার মধ্যে উদ্বাস্তু এবং কর্মহীন হয়ে যাবে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ পরিবার। (১) অথচ Bangladesh Climate Change Strategy and Action Plan 2009 এ খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবেলার কথা বলা হয়েছে (পৃষ্ঠা ২৭) । এছাড়াও এই প্রকল্পে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম বাজার দামের চেয়ে বেশি হবে । এই বিদ্যুৎ আদৌ ঐ এলাকার জনগণের ক্রয়সীমার মধ্যে থাকবে কি না তা ও বিবেচ্য । ফলে এই বিদ্যুৎ প্রকল্প কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথাযথ কারণ রয়ে যায় ।






এমতাবস্থায় আমরা বিকল্প ব্যবস্থায় যেতে পারি । যেমন, জিও-থার্মাল, সৌরশক্তি, বায়ু, ইত্যাদিকে গ্রহণ করতে পারি । সর্বাধিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী চীনও এখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের বিকল্পের দিকে যাচ্ছে । এক্ষেত্রে সবচে পরিবেশবান্ধব হল জিও- থার্মাল প্রযুক্তি । এটি ভূগর্ভের তাপ কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রক্রিয়া । তবে জিও-থার্মাল প্রযুক্তি বেশ ব্যয়বহুল । ছোট পরিসরে হলেও এটি শুরু করা যেতে পারে । সৌরশক্তি বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক । বাংলাদেশের ৭০ ভাগ সূর্যরশ্নি ব্যবহারযোগ্য । বিকিরিত রশ্নির উৎপাদন ক্ষমতা প্রতি মিটারে ৪-৬.৫ মেগা ওয়াট(২) । এছাড়াও এ অঞ্চলে বায়ু প্রবাহিত হয় গড়ে ৩ মিটার/ সেকেন্ড বেগে । এটাকে কাজে লাগানো যেতে পারে বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে । এছাড়াও সমুদ্রস্রোত কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে ।


বাংগ্লাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০০০০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে । যেখানে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র ১৩২০ মেগা ওয়াট । এই স্বল্প পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে সুন্দরবনের মত একটা অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়াটা অত্যন্ত আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত ।

লেখক
শরীফ মুস্তাজীব
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।




(১) Environmental Impact of Coal based Power Plant of Rampal on the Sundarbans and Surrounding areas,  Dr. Abdullah Harun Chowdhury, KU
(২) Present Situation of Renewable Energy of Bangladesh: Renewable Energy Existing in Bangladesh by Md Saydur Rahman,  Sohag Kumar Saha, Md Rakib Hasan Khan, Ummay Habiba, Sheikh Mubinul Hasan Choudhury, PUST