Friday, September 30, 2016

দক্ষিন এশিয়ার রাজনীতি, রাজনীতির দক্ষিন এশিয়া



ভূরাজনীতি কিংবা ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিন এশিয়া পৃথিবীর অন্যতম একটি আলোচিত অঞ্চল । এই অঞ্চলের অন্যতম দুটো শক্তি ভারত ও পাকিস্তানের রাজনীতিও বেশ আলোচিত বিশ্বাঙ্গনে । দক্ষিন এশিয়া বলতে আমরা তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশ ও তার আশপাশের অঞ্চলগুলোকে বুঝি । এখানে বর্তমানে আটটি দেশ অবস্থিত । দেশগুলো হল নেপাল, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, ভূটান, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান । উল্লেখিত সবগুলো রাষ্ট্রই বিভিন্ন আঙ্গিকে গুরুত্ব বহন করে । যে কারনে বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এই অঞ্চলে প্রভাব বলয় গড়তে নানাভাবে তৎপর । আমরা আজ এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিকগুলো আলোকপাত করার চেষ্টা করবো .








ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য ঃ



ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনার শুরুতে এর ভৌগলিক অবস্থান উল্লেখ করা যাক । পূর্বেই আমরা এতদঞ্চলের দেশগুলোর নাম বর্ণনা করেছি । আয়তনে এটি প্রায় ৫.১ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার । যা এশিয়ার প্রায় ১১.৫১% । পূর্বে ভারতের অঙ্গরাজ্য হয়ে উত্তর পশ্চিমে আফগানিস্তান, সর্ব দক্ষিনে মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও ভারত সাগর ।

আমরা সাধারনত ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কার্যাবলী, রাজনৈতিক শক্তি ও ভৌগলিক বিন্যাসের সম্পর্ক বিবেচনা করি । এক্ষেত্রে এই অঞ্চলের দুটো শক্তি ভারত ও পাকিস্তান পারমানবিক শক্তিধর রাষ্ট্র । শক্তিসাম্যের বিবেচনায় এরা দক্ষিন এশিয়ার দুটো ভরকেন্দ্র । এখানে আয়তনে সর্ববৃহৎ হল ভারত । কিন্তু ভৌগলিক বিন্যাসে তার দুর্বলতা রয়েছে । কেননা এর পূর্বাঞ্চলের সাথে এর সংযোগ অনেকটা বিচ্ছিন্ন । অপরদিকে পাকিস্তান পূর্বে আরব সাগর হয়ে ইরান, আফগানিস্তান সংলগ্ন । এ অঞ্চলের তিনটি ভূমি বেষ্টিত রাষ্ট্র আফগানিস্তান, নেপাল ও ভুটান সাগরে প্রবেশাধিকার পায়নি । এখানে অন্যতম একটি ভূরাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ দেশ হল বাংলাদেশ । এর ভৌগলিক অবস্থান আঞ্চলিক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ । কেননা এটি পূর্ব এশিয়াকে সংযুক্ত করেছে ।

রাজনৈতিক কার্যাবলী ও শক্তি বিবেচনায় প্রথমে ভারতের প্রসঙ্গ আসে । এটি ইতোমধ্যে বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে । কিন্তু এর রাজনৈতিক পরিপক্বতা যথেষ্ট নই বলে অনেকের মত। তবে এর সামরিক ও অর্থনৈতিক গতি বেশ বেগবান যা তাকে বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছে। তবে এর আভ্যন্তরীণ জাতিগত বিরোধ ও সাম্প্রদায়িকতা এর অবস্থানকে দুর্বল করে তুলেছে । পাশাপাশি কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তান ও চীনের সাথে সম্পর্কের টানাপড়েন বিদ্যমান । অন্যদিকে পাকিস্তানের আফগান সংলগ্নতা একে সন্ত্রাসবাদের ঝুকিতে রেখেছে । এর রাজনৈতিক স্থিতিশিলতাও যথেষ্ট নয়। আফগানিস্তান ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ ও মার্কিন আগ্রাসনে বিধ্বস্ত । নেপাল ও ভুটানের হিমালয় সংলগ্নতা এর জলবিদ্যুৎ উৎপাদন শক্তি প্রদান করেছে । তবে তারা ভূমি বেষ্টিত হওয়ার কারনে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রতিবেশীর উপর নির্ভরশীল । ভুটান পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে এখন ভারতের মুখাপেক্ষী। অপরদিকে শ্রীলঙ্কা চীনের সহায়তায় সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করেছে । তবে তামিল বিদ্রোহ এর জাতীয় শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে । বাংলাদেশ এ অঞ্চলে এগিয়ে থাকলেও এর অগ্রগতিতেও প্রধান বাধা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও দুর্নীতি । এর সীমানার বিরাট অংশ ভারত বেষ্টিত ।





দক্ষিন এশিয়ার পানি রাজনীতি :



দক্ষিন এশিয়ার রাজনীতির অন্যতম আরেকটি আলোচিত প্রপঞ্চ হল পানি রাজনীতি । মূলত এর কেন্দ্রবিন্দু হল ভারত পাকিস্তান ও বাংলাদেশ । এ অঞ্চলের পানির উৎসগুলো হল হিমালয়, নদী, ভূগর্ভস্থ পানি। আর লোনা পানির উৎস হল সাগর ।তে অঞ্চলে রয়েছে প্রায় ২০ তি আন্তর্জাতিক নদী । উপরোক্ত তিনটি উৎস নিয়েই কমবেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার নদীগুলোতে এমুহূর্তে পানি প্রাপ্তির পরিমাণ কমবেশি তিন হাজার মিলিয়ন একর ফুট। এর বিরাট অংশই প্রবাহিত ভারতের উপর দিয়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীর এই প্রবাহ কমে যেতে পারে।

বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়া সৌভাগ্যবান। বছর জুড়ে এ অঞ্চলে গড়ে ১১৬৪ মিলি–মিটার বৃষ্টি হয়। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় বাংলাদেশে। কিন্তু বৃষ্টিপাতের এ পানি ধরে রাখার পর্যাপ্ত কোন অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। যদিও এখন বিভিন্ন দেশে পানি সংরক্ষণাগার তৈরির হিড়িক পড়েছে– কিন্তু এ অঞ্চলে মাথাপিছু পানি সংরক্ষণ সামর্থ্য এখনও খুব কম– গড়ে ১৭৬ কিউবিক মিটার। ফলে নির্ভরতা থেকে যাচ্ছে নদীর পানির ওপর। কিন্তু সেখানে পানি প্রাপ্তি কমে যাওয়ায় শেষবিচারে চাহিদার যোগান দিতে হচ্ছে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। বিশ্বে জনপ্রতি গড়ে পানি সম্পদ আছে ৬২৩৬ কিউবিক মিটার। অথচ দক্ষিণ এশিয়ায় জনপ্রতি পানিসম্পদ ১১৯৯ কিউবিক মিটার। স্বাভাবিকভাবেই জনসংখ্যা যত বাড়বে মাথাপিছু পানি প্রাপ্তির সম্ভাবনা ততই কমবে। বর্তমানে বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় এক পঞ্চমাংশের বাস দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশে। কিন্তু বিশ্ব মানচিত্রের মাত্র ৩.৩ অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে। এছাড়াও কৃষিনির্ভর এসব দেশের মিঠাপানির প্রায় ৯০ ভাগ ভোক্তা কৃষিখাত । ফলে পানির উৎসের খোঁজে নতুন বসতি নির্মাণের সুযোগও দক্ষিণ এশিয়াবাসীর সীমিত। ফলে পানি নিয়ে সঙ্ঘাত বাড়ছে ।



সীমানা সংঘাত ঃ

আন্তর্জাতিক সীমানা নিয়ে সংঘাত দক্ষিন এশিয়ার অন্যতম একটি আলোচিত বিষয় । লাইন অব কন্ট্রোল নিয়ে ভারত পাকিস্তান দ্বন্দ্ব । বাংলাদেশ ভারত সীমানা দ্বন্দ্ব । যদিও ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ভারত যৌথভাবে ছিটমহল সমস্যা সমাধান করেছে কিন্তু বিএসএফ কর্তৃক সীমান্তে বেসামরিক মানুষ হত্যা বন্ধ হয়নি । অব্যাহত রয়েছে চোরাচালান। এছাড়াও কাশ্মির নিয়ন্ত্রন নিয়ে ভারত পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবে বিরোধে জড়িয়ে আছে ।



অর্থনীতি ঃ

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ মুদ্রানীতির কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয় এমন দাবি করে বিশ্বব্যাংক বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশগুলো ঘাটতি সত্ত্বেও বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বেশ মজবুত করতে সমর্থ হয় । এছাড়ও গেল বছরগুলোতে যেখানে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ছিল ৫।৮ % দক্ষিন এশিয়া ছিল ৬ এরও বেশি অবস্থানে । এ অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি হল এর বিশাল জনগোষ্ঠী । ভারত ইতোমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে ৭ম অবস্থানে রয়েছে । বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ২য় অবস্থানে রয়েছে । নেপাল ও ভুটান জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও রপ্তানিতে বিশেষ অবস্থান অর্জন করেছে। কিন্তু অন্তঃ বাণিজ্যে এদের অবস্থান মাত্র ৫%, যেখানে আসিয়ানে এর পরিমান ২০% , ইউরোপীয় ইউনিয়নে এর পরিমান ১৬% । এক্ষেত্রে আঞ্চলিক যোগাযোগ সহজতর, ভারত পাকিস্তান বিরোধ নিরসন করা সম্ভব হলে এ অবস্থার উন্নতি সম্ভব ।



কাশ্মির সংঘাত ও ভারত পাকিস্তানের বিষফোঁড়া ঃ

কাশ্মির নিয়ে ভারত পাকিস্তান দ্বন্দ্ব ঐতিহাসিকভাবে বিদ্যমান । ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির সময়ই এই সমস্যার সূত্রপাত । এ নিয়ে ১৯৬৬, ১৯৭১ ও ১৯৯৯ সালে তাদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়ে গেছে । ইতোমধ্যে ২০১৬ সালে শুরু হয়েছে যুদ্ধাংদেহী মনোভাব । উরি হামলা ও সারজিকাল স্ট্রাইক নিয়ে চলছে বিশ্ব মিডিয়ায় আলোচনা সমালোচনা । কিন্তু এ অবস্থা চলতে থাকলে বলতে হবে-

" মধ্যপ্রাচ্যের আগুন কি এশিয়ায় ফিরছে ??"



দেখুন আমার আন্তর্জাতিক ব্লগ

শরীফ মুস্তাজীব

শিক্ষার্থী , আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ



চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

1 comment: