Thursday, October 6, 2016

"ট্রাম্পকে" না আমাদের উচিত "ট্রাম্পবাদ" নিয়ে চিন্তিত হওয়া



নাঈম হোসেন



 আসুন প্রথমে একটু ইতিহাস ঘাটি, সুপরিচিত বার্লিন প্রাচীর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির মধ্যকার ভৌগোলিক বিভক্তকারী রেখা হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, আমাদের হয়তো জানা যে এটি মূলত আদর্শগত বিভাজনের প্রতীক হিসেবেই সারা বিশ্বে পরিচিত ছিলো। আদর্শ না বলে, বলা উচিত উগ্র মতাদর্শ যা হবে এটির সঠিক সংজ্ঞায়ন। বার্লিন প্রাচীরের প্রসংগ টেনে আনার একটি কারন এই যে, বার্লিন প্রাচীরের যুগ শেষ হলেও উগ্র মতাদর্শীয় যুগ কিন্তু এখনো শেষ হয়নি। অবশ্য এটি খুবই স্বাভাবিক যে যতদিন সামাজিক,সাংস্কৃতিক, বিশ্বাসগত ভিন্নতা থাকবে ততদিন এই মতাদর্শীয় লড়াইও চলবে। তাই এটি নিয়ে চিন্তিত হওয়ারও কোন কারন নেই যতক্ষন না পর্যন্ত একটি মতাদর্শে বিশ্বাসী মানুষরা অন্য মতাদর্শীয় মানুষদের উপর সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখা দেয়।

 এখন আসুন বর্তমানে নেমে আসি। আগামী নভেম্বরের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে , যদি এর মধ্যেই তাদের কেউ বা উভয়ই মৃত্যুবরন না করে তবে এক. হিলারি ক্লিনটন দুই. ডোনাল্ড ট্রাম্প এ দুজনের কেউ প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হবেন। ধরুন দ্বিতীয় অপশনধারী ব্যক্তিই নির্বাচিত হলেন। শেতাঙ্গ লেন্স দিয়ে বিশ্বকে দেখা যে ব্যক্তির কাছে কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি মাত্রই শেতাঙ্গদের তুলনায় নিকৃষ্ট, যার চোখে চীনারা জাতিগতভাবে চোর,মেক্সিকানরা মাদকব্যবসায়ী ও ধর্ষকামী এবং মুসলিম ধর্মাবলম্বী মাত্রই জঙ্গী। বার্লিন প্রাচীরের প্রসঙ্গ টানার দ্বিতীয় কারন এই যে, এই ব্যক্তিও চান মেক্সিকো সীমান্তে আধুনিক যুগের বার্লিন প্রাচীর তৈরী করতে। এখন এই ধরনের মতাদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তি যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতিটা কোথায়? আচ্ছা আসুন অলীক সম্ভাব্যতা বাদ দিয়ে কিছু বাস্তব সম্ভাব্যতায় আসি।এ ক্ষেত্রে কিছু প্রশ্ন সামনে চলে আসেঃ
1. ডোনাল্ড ট্রাম্প কি মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হবেন?
2. অথবা কেন তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন না?
3. তিনি প্রেসিডেন্ট হলেই বা ক্ষতি কি?
4. তিনি যদি প্রেসিডেন্ট নাও হন, তাকে নিয়ে ভয়টা কোথায়?
 5. আমাদের আসলে কি নিয়ে ভয় পাওয়া উচিত? প্রথম দুটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর এবং এর দায়ভার দুটোই মার্কিন জনগনের উপর বর্তায়। আমরা এ ভূখন্ডে বসে যেটুকু করতে পারি তাহলো অনুমান এবং আশাবাদ। পরিসংখ্যান এবং বিভিন্ন জরিপ অবশ্য বলেঃ ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। যে ব্যক্তিকে তারই রাজনৈতিক দলের অন্যান্য প্রভাবশালী রাজনীতিবিদরা সমালোচনায় বিদ্ধ করেন, যার সম্পর্কে অর্থনীতিবিদদের মন্তব্যও আশাবাদী নয় তার নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা কমই বলতে হয়। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান তো বলেই দিয়েছেনঃ ট্রাম্প একটা অকাট মূর্খ, চূড়ান্ত অসত্‍, অসংলগ্ন, অপরিনত, আত্বম্ভরী এক মাস্তান। তো এই অকাট মূর্খ,স্বল্পজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিকে কি আমেরিকান জনগন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করবে? এখানেই আমাদের আশাবাদ যে, আমেরিকার অধিকাংশ জনগন হয়তো এতোটা স্বল্পজ্ঞানসম্পন্ন না। কিন্তু এই জ্ঞানবুদ্ধি, বিচার বিবেচনাবোধ কাউকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করে না, দিনশেষে এটা করে 'ভোট'। আর যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন সমীকরন টা সহজঃ ডলার=ভোট। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বরাবরই পক্ষে গেছে এবং ট্রাম্প হিলারির চেয়ে ধনী। শুধু ধনীই নয় তার তোলা নির্বাচনী চাঁদার পরিমানও হিলারির তুলনায় বেশি। তাছাড়া ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য তিনি বিভাজনের রাজনীতি ভালো বোঝেন এবং একটি বড় অংকের শেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে তিনি তার পেছনে এনে দাড় করিয়েছেন। যে জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে তীব্র বিদেশভীতি এবং তাদের ধারনা অভিবাসনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের যে জনতাত্বিক পরিবর্তন হচ্ছে তাতে তারা একসময় সংখ্যালঘুতে পরিনত হবে এবং বহুত্ববাদী সমাজে তাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাবে। তাহলে দেখা যায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনার পেছনেও কারন আছে। এবার আসি,'আমেরিকাকে পুনরায় মহান দেখতে চাওয়া' এই ব্যক্তি নির্বাচিত হলে ক্ষতিটাই বা কি? ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোই আসলে বলে দেয় তিনি নির্বাচিত হলে ক্ষতিটা ঠিক কোন জায়গায়। কোন মুসলমানকে আমেরিকায় প্রবেশ করতে না দেয়া, মেক্সিকোর সীমানায় হাজার মাইল দীর্ঘ দেয়াল নির্মান,মধ্যপ্রাচ্যের সকল তেলক্ষেত্র দখলে আনা, ইরানের উপর বিমান হামলা ,এসব অঙ্গীকার তো খুবই সাধারন, যে ব্যক্তি তার উপদেষ্টাদের জিজ্ঞেস করেনঃ পারমানবিক অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র কেন তা ব্যবহার করেনা? তিনি নির্বাচিত হলে কি ক্ষতি হবে তা বোধগম্য। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের ক্ষমতার বলয় কখনো একজনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়না এবং প্রেসিডেন্ট খুব কমই তার ইচ্ছানুযায়ী ক্ষমতার ব্যবহার করতে পারে। কারন মূল ক্ষমতা থাকে দেশের শীর্ষ 1% (ধনী ব্যবসায়ী,রাজনীতিবিদ,উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তা) এর হাতে। ট্রাম্প যদি প্রেসিডেন্ট হয়ে ভারসাম্যহীন কিছু করতেও চান উপরোক্ত 1% ব্যক্তিরা তা করা থেকে তাকে বিরত রাখবেন । তাহলে ট্রাম্পকে নিয়ে আসলে ভয়টা কোথায়? আমাদের ভয়টা আসলে ট্রাম্প কে নিয়ে নয়, 'ট্রাম্পবাদ' কে নিয়ে। 'আইএস' যেমন কোন জঙ্গীগোষ্ঠী না, আইএস একটি মতবাদ। 'ট্রাম্পও' আসলে কোন ব্যক্তি না, ট্রাম্প একটি মতবাদের নাম। এটা মনে করলে ভুল হবে যে ট্রাম্প একাই একজন ভারসাম্যহীন ব্যক্তি, বরং তার পেছনে আছে আরো প্রায় 3 কোটি ব্যক্তি যারা তাকে প্রাইমারীতে, ককাসে ভোট দিয়ে এ পর্যন্ত এনেছেন। ট্রাম্প আসলে তার মতোই ফ্যাসিস্ট ও ভারসাম্যহীন একটি প্রজন্মকে গড়ে তুলছে যারা ট্রাম্প না থাকলেও ট্রাম্পকে ধারন করবে।ধারন করবে উগ্র জাতীয়তাবাদ, শেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিভাজনকে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি প্রেসিডেন্ট নাও হন, তাকে নিয়ে ভয়টা ঠিক এ জায়গায়। এবং সর্বশেষ প্রশ্নের উত্তরঃ আমাদের আসলে ভয় পাওয়া উচিত 'ট্রাম্পবাদকে', শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয় সারাবিশ্বের যেকোন প্রান্তে বেড়ে ওঠি ট্রাম্পবাদ কে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

No comments:

Post a Comment