ক্ষুদ্র একটি বিশ্ব আজ সারা বিশ্বকে
স্থম্ভিত করে দিয়েছে, যার
নাম করোনা বা কোভিড-১৯। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবকিছু থেমে গেলেও থেমে নেই বিতর্ক।
করোনা আসলে কী, এটি
কি নিছক একটি জীবাণু নাকি অন্য কিছু! এর পেছনে কি কোন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এর কারসাজি
আছে? ভবিশ্ষ্যতে
কি এই ধরনের ভাইরাস আবারো হানা দেবে?এই ধরনের নানান প্রশ্ন ভেসে বেড়াচ্ছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে।
আজ আমরা এই ধরনের ৫ টি প্রশ্নের উত্তর খোজার চেষ্টা করবো যা করোনা পরিস্থিতিতে
আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে আরো উষ্ণ করে তুলেছে।
#প্রশ্ন
১ করোনা বিস্তারের জন্য কি চীন ই দায়ী?
করোনা'র উৎপত্তি হয় চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান থেকে। ২০১৯
সালের ৩১ ই ডিসেম্বর করোনা'র
ব্যাপারে জানতে পারে বিশ্ববাসী। অজানা এই রোগের প্রাদুর্ভাবের তথ্য সরবপ্রথম যে
ডাক্তার প্রকাশ করেন না নাম লী ওয়েনলিয়াং। কিন্তু চীন সরকার প্রথমে তথ্য গোপনের
চেষ্টা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ওই ডাক্তারকে আটক করার খবরও পাওয়া যায়। কিন্তু
করোনা কে থামানো যায় নি। চীনে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এই ভাইরাস। প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, চীনের প্রাথমিক
গাফলতির কারনেই করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। চীন তথ্য গোপনের জন্য যে সময়ক্ষেপন করে তাতেই
ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায় বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই চীনকেই করোনা বিস্তারের জন্য
দায়ী করা হচ্ছে। আমেরিকার এক আইনজীবী ও কিছু ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে চীনের বিরুদ্ধে ২০
কোটি ডোলার এর ক্ষতিপূরণ মামলা করেছে বলে জানা গেছে ব্লুমবারগ এর খবরে। গত ১২ ই
মার্চ ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে এই মামলা করা হয়। একই ধরনের মামলা করা হয়েছে টেক্সাস ও
নেভাদাতেও।
#প্রশ্ন
২ করোনা কি একটি জীবাণু অস্ত্র?
জীবাণু অস্ত্রের ধারণাটা নতুন নয়
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। ৭০ এর দশকে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে কিউবা জীবাণু অস্ত্র
ব্যবহারের অভিযোগ তোলে আমেরিকার বিরুদ্ধে। বলা হয় যে, ১৯৭৮-৮০ সালের মধ্যে
কিউবাতে ডেঙ্গুজরে প্রায় ৪ লাখ মানুষ মারা যায় তার পেছনে রয়েছে আমেরিকার গোয়েন্দা
সংস্থা সি আই এ। কেননা তৎকালীন সময়ে কিউবা ছিল আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী সোভিয়েত
ইউনিয়নের মিত্র। এছাড়াও ২০১৯ সালে এন্থ্রাক্স এর আবির্ভাবকেও জীবাণু অস্ত্রের
ব্যবহার বলে মনে করা হয়। দাবী করা হয় এটি ছিলো আলকায়েদার একটি মরনাস্ত্র। করোনাকে ঘিরে জীবাণু
অস্ত্রের আলোচনার শুরু হয় ওয়াশিংটন টাইমস এর একটি প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদনে দাবী
করা হয় ওহান ইন্সটিটিউট অব ভাইরোলজি থেকেই করোনা ছড়িয়েছে। চীনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের
এক কর্মকর্তা পালটা দমকরতান এই ভাইরাস সাম্প্রতিকসময়ে উহান ভ্রমণকারী একটি মার্কিন
সামরিক দলের মাধ্যমে ছড়িয়েছে। তবে করোনা কেন্দ্রিক এই দাবী এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে
প্রমাণের কোন তথ্য পাওয়া যায় নি।
# প্রশ্ন
৩ কোন দেশগুলো করোনা মোকাবেলায় সফল হয়েছে?
কিভাবে?
এখনো পর্যন্ত করোনা মোকাবেলায় সফল
দেশগুলোর তালিকায় প্রথমে রয়েছে সাউথ কোরিয়া,
সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান। তাদের কৌশল ছিল ব্যাপক পরীক্ষা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই তারা ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহন করে। অন্যদিকে
আমেরিকা, ইরান
এর মতো কিছু দেশ করোনা মোকাবেলায় রাজনৈতিক ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। আরো কিছু দেশ
করোনা'য়
আক্রান্ত হয়নি। এগুলো হল মাক্রোনেশিয়ান দ্বীপরাষ্ট্রগুলো, তাজিকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, এবং ইয়েমেন। দেশগুলোর
সংখ্যা প্রায় ১৮। দেশগুলো ক্ষুদ্রাকার এবং অনেকটা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। এই
তালিকায় উত্তর কোরিয়ার নামও আছে। তবে দেশটির দাবী এখনো গ্রহনযোগ্য নয়, কেননা উত্তর কোরিয়া
বহিরাগত কোন সাংবাদিককে তথ্য সংগ্রহের অনুমতি দেয় না। এই দেশগুলোর করোনামুক্ত
থাকার মুলে হল বিচ্ছিন্নতা নীতি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। করোনা সংবাদে তারা
তাৎক্ষনিকভাবে বিদেশ থেকে আগমনকারী সীমিত করে নেয়।
# প্রশ্ন
৪ করোনা বিশ্বব্যবস্থায় কী প্রভাব ফেলবে?
বৈশ্বিক পরিসরে করোনা'র প্রভাব কম নয়। এটি রাজনীতি থেকে শুরু
করে অর্থনীতি, নিরাপত্তা
সমাজনীতিসহ অনেকগুলো ক্ষেত্রে বিস্তৃত। তবে এরমধ্যে সবচেয়ে মৌলিক অঙ্গনটি হল
নিরাপত্তা ব্যবস্থা। করোনা প্রথগত নিরাপত্তা ব্যবস্থায় (traditional security) বিরাট
প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। সামরিক অস্ত্র নিরাপত্তা দানে কতটা সক্ষম হবে আগামী দিনে
তা নিয়ে প্রশ্ন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের। মানব নিরাপত্তা বা হিউম্যান
সিকিউরিটি প্রথা প্রাধান্য লাভ করবে। সামরিক নিরাপত্তার মতো খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ নিরাপত্তা
গুরুত্ব লাভ করবে। পাশাপাশি করোনা কে কেন্দ্র করে চীনের উত্তানের গন্ধ পাচ্ছেন অনেক
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক। ১৯১৮ সালের "স্প্যানিশ ফ্লু "কে কেন্দ্র করে
বিশ্বনেতৃত্বে পরিবর্তন ঘটে, তৎকালীন পরাশক্তি যুক্তরাজ্যের পতন ঘটে; তার পুনরাবৃত্তি ঘটতে
যাচ্ছে বলে অনেকের মত।
# প্রশ্ন
৫ ভবিষ্যতে আবারো এই ধরনের ভাইরাস এর প্রাদুর্ভাব হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি?
এই প্রশ্নের উত্তবে হ্যাঁ বলা যায়
ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে। কেননা করোনা হলো কোভিড ফ্যামিলির সদস্য। পূর্বেকার সার্স ও এই
গোত্রের সদস্য। এছাড়া করোনা আর এন এ টাইপ ভাইরাস,
যা দ্রুত মিউটেশন ঘটায়,
ফলে বিভিন্ন ধরণের বৈশিষ্ট্য ধারন করতে পারে। আর করোনা'র উৎপত্তি আরেকটি কারন ধরা হচ্ছে
বন্যপ্রানী। বন্যপ্রাণী যেমনঃ বাদুর,
ইদুর এগুলোর মাধ্যমে এই ভাইরাসগুলো ছড়ায়। দেখা গেছে চীনের যে
সকল স্থান থেকে এই ভাইরাসগুলো ছড়িয়েছে সেখানে বিভিন্ন বাজারে এই ধরনের বন্যপ্রাণী
ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। ভবিষ্যতে এই ধরনের বন্যপ্রাণী শিকার অব্যাহত থাকলে এই ধরনের
ভাইরাস আবারো উৎপত্তি লাভ করার সম্ভাবনা প্রবল।
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা! করোনা কে ঘিরে
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ধরনের হাজারো প্রশ্ন সবার মুখে মুখে। আমরা তা থেকে এই ৫
প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করলাম। আর কোন প্রশ্নটা প্রাসঙ্গিক বলে আপনি মনে করেন তা
কমেন্ট এ জানাবেন আশা করি।
Editor, International Affairs

No comments:
Post a Comment